নিত্যানন্দ প্রভু

শ্রী নিত্যানন্দ প্রভু

শ্রীচৈতন্য লীলার ব্যাস শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর নিজ প্রভু নিত্যানন্দকে বহু নামে অভিহিত করেছেন। নিত্যানন্দ অবধূত, শ্রীনিত্যানন্দ চন্দ্র, নিত্যানন্দ প্রভু নিত্যানন্দ মহামহেশ্বর, নিত্যানন্দ সিংহ , নিত্যানন্দ মহামল্ল, অবধূত চন্দ্র, অবধূত রায় ও শ্রীচৈতন্যচন্দ্রের প্রিয় বিগ্রহ ইত্যাদি। শ্রীগৌরসুন্দর মহাবদান্য কিন্তু শ্রীনিত্যানন্দ যাকে আত্মসাৎ করেন নাই, শ্রীগৌরসুন্দর তাকে কখনই কৃপা করেন না। শ্ৰীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর বলেছেন।
সংসারের পার হই ভক্তির সাগরে ।
যে ডুবিবে, সে ভজুক নিতাই চাদেরে।
বৈষ্ণব চরণে মাের এই মনস্কাম।
ভজি যেন জন্মে জন্মে প্রভু বলরাম।
। চৈঃ ভাঃ আঃ ১৭৭৭৮)
শ্ৰীনিত্যানন্দ প্রভু বলদেবভিন্ন বিগ্রহ। শ্ৰীবৃন্দাবন দাস এভাবে নিজ ইষ্ট দেবের বন্দনা করেছেন-
ইষ্টদেব বন্দো মাের নিত্যানন্দ রায়।
চৈতন্যের কীর্তি ক্ষুরে যাঁহার পায়।
সহস্র বদন বন্দো প্রভু বলরাম।
যাহার সহস্র মুখে কৃষ্ণ যশােধাম।
মহারত্ন থুই যেন মহাপ্রিয় স্থানে।
যশেরত্ন ভাণ্ডার অনন্ত বদনে।
অতএব আগে বলরামের সুবন।
করিলে সে মুখে ঘুরে চৈতন্য কীত্তন।
সহস্রেক ফনধর প্রভু বলরাম।
যতেক করয়ে প্রভু সকল-উদ্দাম ।
( চৈঃ ভাঃ আদি: ১১১-১৫)
শ্রী কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর স্বরূপ সম্বন্ধে বৃন্দাবন দাসের শ্রীচরণানুস্মরণে এরূপ বর্ণনা করেছেন-
সর্ব-অবতারী কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান ।
তাহার দ্বিতীয় দেহ শ্রী বলরাম।
একই স্বরূপ-দোহ, ভিন্ন মাত্র কায় ।
আদ্য কায়ৰহ, কৃষ্ণ লীলার সহায় ।
সেই কৃষ্ণ-নবদ্বীপে চৈতন্যচন্দ্র।
সেই বলরাম—সঙ্গে নিত্যানন্দ ।
( চৈঃ চঃ আদি ৫। ৪-৬)
এখন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর আবির্ভাব সম্বন্ধে শ্ৰীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর এরূপ বর্ণনা করছেন—
ঈশ্বরের আজ্ঞায় আগে এ অনন্ত ধাম ।
রাঢ়ে অবতীর্ণ হৈল নিত্যানন্দ রাম।
মাঘমাসে শুক্লা ত্রয়ােদশী শুভদিনে।
পদ্মাবতী গর্ভে একচাকা নাম গ্রামে ।
হাড়াই পণ্ডিত নামে শুদ্ধবিপ্র রাজ ।
মূলে সৰ্ব্বপিতা তানে করে পিতা ব্যাজ।
( চৈঃ ভাঃ আদি ২১২৮-১৩)
রাঢ় দেশ, বর্ধমান জেলার অন্তর্গত। একচাকা গ্রাম রাঢ় পরগণার মধ্যে ই, আই, আর লুপ লাইনে মল্লার পুর ষ্টেশন হ’তে প্রায় চারিক্রোশ পূৰ্ব্ব দিকে একচাকাগ্রাম, বর্তমান ঐ গ্রামের নাম নিত্যানন্দ প্রভুর পুত্র বীর চন্দ্রের নামে বীরচন্দ্র পুর নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে । নিত্যানন্দ প্রভু এক চাকা গ্রামে অবতীণ হন । পিতার নাম হাড়াই পণ্ডিত বা হাড়ই ওঝা। ইনি মৈথিল ব্রাহ্মণ ছিলেন, উপাধ্যায় কৌলিক উপাধির অপভ্রংশই ওঝা । মাতার নাম শ্রী পদ্মাবতী দেবী। ব্রাহ্মণ দম্পতী নিত্য ভগবদ আরাধনার ও বৈষ্ণব সেবার ফলে, আদি বৈষ্ণব ধাম শ্রীঅনন্ত স্বয়ং পুত্ররূপে অবতীর্ণ হন। নিত্যানন্দ প্রভুর আবির্ভাবে সমস্ত রাঢ় দেশে সর্ব সুমঙ্গল অভ্যুদয় লক্ষিত হয়েছিল। দ্বাপর যুগে যেমন বলদেব শ্রীকৃষ্ণের অগ্রজ রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তেমনি কলিযুগেও শ্রীনিত্যানন্দ শ্রীগৌরসুন্দরের বড় ভ্রাতা রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। যখন শ্রীগৌরসুন্দর নবদ্বীপ মায়াপুরে একবৎসর পরে আবিভূত হলেন, তখন অন্তর্যামী নিত্যানন্দ প্রভু তার আবির্ভাব জানতে পেরে আনন্দে মহা হুঙ্কার ধ্বনি করে উঠলেন। ঐ হুঙ্কার ধ্বনি শুনে দেশবাসী জন সাধারণ নানাপ্রকার মত প্রকাশ করেছিলেন। কেহ বললেন বজ্রপাত হয়েছে, কেহ বললেন রাঢ় দেশে মৌড়েশ্বর নামক যে শিব আছেন তিনি হুঙ্কার করে উঠেছেন, কেহ বললেন ভগবান্ গর্জন করেছেন, এরূপ অনেক লোক অনেক রূপ কথা বললেন। বৃন্দাবন দাস তার ইষ্ট দেব নিত্যানন্দ প্রভুর জন্ম লীলা, শৈশব লীলা, পৌগণ্ড লীলা, কৈশাের লীলা ও যৌবন লীলাদি দিব্যাতি দিব্য লােকাতীত অলৌকিক স্বরূপ বর্ণনা করেছেন। শ্রীগৌরসুন্দরের যাবতীয় লীলা লৌকিক ভাবের মধ্যে ঈশ্বরীয় ভাবের কথা বলেছেন। এরূপ দুই প্রভুর লীলার মাধুৰ্য তিনি আস্বাদন করেছেন। শ্রী নিত্যানন্দের শৈশব লীলা অলৌকিক দিব্য ভাবাবেশে রামচন্দ্রের ও শ্রীকৃষ্ণচন্দ্রের মধুর বাল্য লীলাদির অভিনয়ের কথা বর্ণনা করেছেন। জগৎ মধ্যবত্তি শিশুগণের যে ধর্ম-ভোজনার্থে বার বার ক্রন্দন চাঞ্চলত ভয় ভাঁতি স্বভাব ও বস্তুর অপচয় প্রভৃতি ধর্মের কথা নিত্যানন্দ চরিতে বলেন নাই, কিন্তু গৌরসুন্দরের চরিতে বিশেষ ভাবে বলেছেন। শ্ৰীবৃন্দাবন দাস নিত্যানন্দের অলৌকিক শৈশব লীলা এরূপ বর্ণনা করেছেন শিশুগণ সঙ্গে প্রভু যত ক্রীড়া করে।
শ্রীকৃষ্ণের কার্যা বিনা আর নাহি দূরে।
দেব সভা করেন মিলিয়া শিশুগুণে।
পৃথিবীর রূপে কেহ করে নিবেদনে।
তবে পৃঙ্খী লৈয়া সবে নদী তীরে যায় ।
শিশুগণ মেলি স্তুতি করে উৰ্দ্ধ রায়।
কোন শিশু লুকাইয়া উব্ধ করি বোলে।
জন্মিবঙ, গিয়। আমি মখুর গােকুলে ।
কোনদিন নিশভাগে শিশুগণ লৈয়া।
বসুদেব দেবকীর কয়েন বিয়া।
বন্দি ঘর করিয়া অত্যন্ত নিশা ভাগে।
কৃষ্ণ জন্ম করায়েন কেহ নাহি জাগে।
গােকুল সৃজিয়া ৬থি আনেন কৃষ্ণেরে।
মহামায়া দিল। লৈয়া ভণ্ডিলা কংসেরে।
কোনদিন সাজায়েন পুতনার রূপে।
কেহ স্তন পান করে উঠি তার বুকে। ইত্যাদি ।
আবার রামলীলা অভিনয় করছেন
কোনদিন নিত্যানন্দ সেতুবন্ধ করে ।
বানরের রূপ সব শিশুগণ ধরে ।
ভেরেণ্ডার গাছ কাটি বেলায়েন জলে ।
শিশুগণ মিলি জয় রঘুনাথ, বলে ।।
লক্ষ্মণ রূপ প্রভু ধরিয়া আপনে।
ধনু ধরি কোপে চলে সুগ্রীবের স্থানে।
আরেরে বানরা মাের প্রভু দুঃখ পায়।
প্রাণ না লহমু যদি তবে ঝাট আয় ।
মাল্যবান্ পর্বতে মাের প্রভু পায় দুঃখ ।
নারীগণ লৈয়া বেটা তুমি কর সুখ ।।
কোনদিন ক্রুদ্ধ হৈয়া পরশুরামেরে ।
নার দোষ নাহি বিপ্র পলাহ সত্ত্বরে।
লক্ষণের ভাবে প্রভু হয় সেইরূপ।
বুঝিতে না পারে শিশু মানয়ে কৌতুক ।
.
ইন্দ্রজিৎ বধ লীলা কোনদিন করে।
কোনদিন আপনে লক্ষণ ভাবে হারে ।
বিভীষণ করিয়া আনেন রাম স্থানে।
লঙ্কেশ্বর অভিষেক করেন তাহানে।
কানাশ শু বােলে, মুঞি আইলু রাবণ ।
শক্ত শেল হানি এই সম্বর লক্ষণ।
৩৩ বলি পদ্ম পুষ্প মারিল ফেলিয়া।
লক্ষণের ভাবে প্রভু পড়িলা ঢলিয়া।
। চৈঃ ভাঃ আদি নবম অধ্যায়)
শ্রী নিত্যানন্দ প্রভু এভাবে যখন মূর্ছা গেলেন তখন সঙ্গের শিশুণ তাকে জাগানাের চেষ্টা করতে লাগলেন, কিন্তু যেন তিনি প্রাণ শূন্য ভাবে পড়ে রইলেন, তা দেখে শিশুগণ এবার ভীত হয়ে শীঘ্র নিত্যানন্দের মাতা ও পিতার নিকট এসে এসব কথা জানালেন ! তারাও শীঘ্র তথায় ছুটে এলেন, দেখলেন সত্য সত্যই যেন প্রাণশূন্য নিত্যানন্দ। কেহ বললেন শিশু ভাবাবিষ্ট হয়েছে; কেহ বললেন অভিনয় করছে, হনুমান ঔষধ দিলে ভাল হবে। তখন কোন শিশু হনুমানের ভাবে শীঘ্র ঔষধ নিয়ে এলেন। এক শিশু বৈদ্য বেশে সেই আনীত বৃক্ষলতার রস নিড়াইয়া নিত্যানন্দের নাসাতে দিলেন। তৎক্ষণাৎ নিত্যানন্দ প্রভু চৈতন্য লাভ করে উঠে বসলেন, সকলে অবাক হয়ে গেলেন, বললেন আমরা কখন এরূপ খেলা দেখিনি। সকলে তখন জিজ্ঞাসা করলেন তুমি এরূপ খেলা কোথায় শিখলে। নিত্যানন্দ বললেন—আমার সকল লীলা। অর্থাৎ স্বতঃসিদ্ধ লীলা। কেহই কিন্তু নিত্যানন্দের যথার্থ স্বরূপ জানতে পারলেন না। “চিনিতে না পারে কেহ বিষ্ণুমায়া-বশ” এরূপ ভাবে নিত্যানন্দ প্রভু শৈশব ও পৌগণ্ড অতিক্রম করে কৈশাের বয়সে পদার্পণ করলেন। তখন তার বৎসর বার বয়স । নিতানন্দ হাড়াই ও পদ্মাবতীর একমাত্র নয়ন মণি ও প্রাণ ছিলেন। মাতাপিতা নিত্যানন্দকে একক্ষণ না দেখলে থাকতে পারতেন না। হাড়াই পণ্ডিত সর্ববিধ কার্যের মধ্যে থাকলেও প্রাণটি নিত্যানন্দের প্রতি পড়ে থাকত।
একদিন এক বৈষ্ণব সন্ন্যাসী হাড়াই পণ্ডিতের ঘরে অতিথি হলেন। হাড়াই পণ্ডিত সন্ন্যাসীকে খুব যত্নে সেবা করতে লাগলেন। রাত্রিকালেও সন্ন্যাসী হাড়াই পণ্ডিতের ঘরে অবস্থান করলেন। নিত্যানন্দ প্রভু সন্ন্যাসীকে পেয়ে আনন্দে বিভাের হলেন। সমস্ত রাত্রি সন্ন্যাসীর সঙ্গে কৃষ্ণ কথায় যাপন করলেন। নিত্যানন্দের সর্বাকর্ষণ স্বভাবে সন্ন্যাসী পরমাকৃষ্ট হলেন। নিত্যানন্দের সঙ্গ ত্যাগ করতে আর ইচ্ছা করলেন না। প্রাতঃ-কালে সন্ন্যাসী বিদায় নিতে উন্মুখ হয়ে মনের গৃঢ় অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন ; ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীর কাছে নিত্যানন্দকে ভিক্ষা চাইলেন। ব্রাহ্মণ-ব্রাক্ষণী সন্ন্যাসীর কথা শুনে বিনা মেঘে বজ্রপাতের ন্যায় যেন মূর্ছা প্রাপ্ত হলেন, কি নিদারুণ কথা, একমাত্র প্রাণের প্রাণস্বরূপ পুত্র নিত্যানন্দকে ভিক্ষা দিতে হবে। পরিশেষে ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী ধৈর্য ধারণ পূৰ্ব্বক বিচার করলেন, “পূর্ব কালে মহারাজ দশরণ যেমন বিশ্বামিত্রের হাতে রাম লক্ষ্মণকে ভিক্ষা দিয়েছিলেন সেই রূপ আজ এ সন্ন্যাসীর হাতে নিত্যানন্দকে সমর্পণ করব, নতুবা আমাদের পরম অধর্ম হবে। ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী ক্রন্দন করতে করতে নিত্যানন্দকে অর্পণ করলেন। অতীব অনুনয়ের সঙ্গে বললেন আমাদের একমাত্র প্রাণটিকে আপনাকে দিলাম । আপনি সর্বতােভাবে একে রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। সন্ন্যাসীর সঙ্গে শ্রীনিত্যানন্দ তীর্থ ভ্রমণে চললেন। শ্রীচৈতন্য ভাগবতে নবম অধ্যায়ে নিত্যানন্দের তীর্থ ভ্রমণ কথাটি বিস্তৃত 'ভাবে আছে।
পশ্চিম ভারতে ভ্রমণ কালে নিত্যানন্দ প্রভুর সঙ্গে অকস্মাৎ শ্রীমাধবেন্দ্র পুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎকার হয়। উভয়ের দর্শনে উভয়ের হৃদয়ে প্রেম সমুদ্র যেন উথলে উঠল। উভয়ের অপূর্ব প্রেমাবেশ দর্শনে ঈশ্বর পুরী প্রভৃতি শিষ্যগণ বিস্মিত হলেন। নিত্যানন্দপ্রভুকে পেয়ে মাধবেন্দ্র পুরীপাদ আনন্দে এরূপ বলে-ছিলেন।
* প্রেম না দেখিলু কোথ।
সেই মোর সৰ্ব্ব তীর্থ হেন প্রেম যথা।
জানি কৃষ্ণের কৃপা আছে মাের প্রতি
নিত্যানন্দ হেন বন্ধু পাই সংহতি :
যে সে স্থানে যদি নিত্যানন্দ সঙ্গ হয়।
সেই স্থান সর্বতীর্থ বৈকুণ্ঠাদিময ।
নিত্যানন্দ হেন ভক্ত শুনিলে শ্রবণে ।
অবশ্য পাইব কৃষ্ণচন্দ্র সেই জনে।
( চৈ ভ: আদিঃ ৯/১৮২-১৮৫)
কিছু দিন নিত্যানন্দ প্রভু শ্রী মাধবেন্দ্ৰ পুৱীর সঙ্গে পরম সুখে কৃষ্ণালাপনে অতিবাহিত করলেন। অনন্তর নিত্যানন্দ প্রভু সেতুবন্ধাদি তীর্থ দর্শনে চললেন : ক্রমে তিনি ধনুস্তীর্থ, বিজয় নগর, অবন্তি দেশ ও গােদাবরী প্রভৃতি দর্শন করে পুরী ধামে এলেন। জগন্নাথ দর্শনে অর্তী প্রেমাবিষ্ট হয়ে নৃত্য গীতাদি করলেন। কয়েক দিবস তথায় অবস্থানের পর তিনি গঙ্গাসাগর তীর্থে আগমন করলেন। এখান হতে শ্রীব্ৰজ মণ্ডলে আগমন করলেন। ব্রজ ধামে আগমনে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু এক অপূৰ্ব্ব প্রেমাবস্থা প্রাপ্ত হলেন।
নিরবধি বৃন্দাবনে করেন বসতি।
কৃষ্ণের আবেশে না জানেন দিবারাতি ।।
আহার নাহিক কদাচিৎ দুগ্ধ পান।
সেহ যদি অযাচিত কেহ করে দান
(চৈঃ ভাঃ আদি ৯/২৫-২৬)
যখন বৃন্দাবনে শ্রীনিত্যানন্দ এরুপ ভাবাবেশে অবস্থান করছিলেন তখন, এদিকে গৌরসুন্দর বিদ্যার বিলাসাদি সমাপ্ত করে গয়া ধামে পিতৃ কর্ম সমাপন ঈশ্বর পুরীকে তথায় পেয়ে তার কাছ থেকে মন্ত্র দীক্ষা গ্রহণ করলেন, এবার ভাগাবত ধর্ম প্রচারের জন্য ও জীব কুলের উদ্ধারের জন্তু তিনি আত্ম-প্রকাশ করলেন এবং নিরন্তর ভক্তগণ সঙ্গে প্রেম রসাস্বাদন করতে লাগলেন। শ্রীবাস পণ্ডিতের ভবন হল তর সংকীর্তন সদন। তিনি ভক্তগণসঙ্গে প্রেমারস আস্বাদন করছেন। কিন্তু সাধারণ অন্য কোন জীবকে দিচ্ছেন না, যেন কর প্রতীক্ষায় তিনি আছেন। কে জানে, তার সেই গৃঢ় অভিপ্রয়। নিত্যানন্দ হবেন প্রেমধন বিতরণের প্রধান সহায়ক তাই গৌরসুন্দর তার প্রতীক্ষা করছেন। এদিকে বৃন্দাবনে নিত্যানন্দ প্রভু কৃষ্ণপ্রেমাবেশে কৃষ্ণানুসন্ধান করছেন, সব মন্দির সিংহাসন যেন শূন্য, কৃষ্ণ নেই কোথায় কৃষ্ণ কেথায় কৃষ্ণ বলে সর্বত্র অনুসন্ধান করতে যেন শেষে দৈব বাণীতে শুনলেন—তিনি এখন নদীয়াতে বলা হয়েছেন এবং সংকীৰ্ত্তন বিলাস করছেন। একথা শুনে নিত্যানন্দ চললেন ব্রজ মণ্ডল থেকে গৌড় অভিমুখে। কোন দিন অযাচিত ভাবে কোথায় একটু দুগ্ধ পান নহত উপবাস। এ ভাবে শীঘ্রই গৌড়দেশে নবদ্বীপে আগমন করলেন। নবদ্বীপে মায়াপুরে শ্রীনন্দন আচাৰ্য্য নামক এক পরম মহাভাগবত বাস করতেন গঙ্গাতটে, অকস্মাৎ শ্রীনিত্যানন্দ তার গৃহে উপস্থিত হলেন। শ্রীনন্দন আচার্য আজানুলম্বিত সেইপুরুষ রতনকে দর্শন করে ভক্তিভরে দণ্ডবন্নতি পূৰ্ব্বক পূজাদি করলেন এবং ভিক্ষা করিয়ে গৃহেতে রাখলেন।
এদিকে অন্তর্যামী শ্রীগৌরসুন্দর তা জানতে পেরে অন্তরে অন্তরে শীঘ্রই তার সঙ্গে মিলিত হবার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করলেন এবং সত্বর প্রাতঃ শ্রীবাস অঙ্গনে আগমন করলেন। ক্রমে ভক্তগণ আগমন করতে লাগলেন। সকলেই প্রভুর চারিদিকে উপবেশন করলেন, এমন সময় মহাপ্রভু ভঙ্গিপূর্বক বলতে লাগলেন—আমি আজ শেষ রাত্রে এক সুস্বপ্ন দেখেছি, শেষরজনীর স্বপ্ন প্রায় মিথ্যা হয় না ।
সে কথা শুনে ভক্তগণ অপূৰ্ব স্বপ্ন কথা শুনতে উৎসুক হলেন। এখন মহাপ্রভু বলতে লাগলেন—এক তালধ্বজ রথ যেন আমার গৃহ দ্বারে উপনীত হল, ঘর মধ্য এক বিশালকায় মহাপুরুষ তার স্কন্ধে হল মুষল । তিনি নীল বসন পরিহিত তার বাম হাতে বেত্ৰ নিৰ্ম্মিত কমলু। তিনি পুনঃ পুনঃ জিজ্ঞাসা করছেন—এ বাড়ী কি নিমাই পণ্ডিতের ? এ বাড়ী কি নিমাই পণ্ডিতের ? আমি তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন আমি তােমার ভাই। আগামী কল্য পরস্পর পরিচয় হবে। তার কথা শুনে আমার বড়ই আনন্দ হল, স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল, নিশা শেষ হল। এ কথা বলতে বলতে মহাপ্রভু এক দিব্য ভাবে বিভাের হলেন। কিছুক্ষণ ভাবাবিষ্ট থাকার পর বাহ্য দশা প্রাপ্ত হলেন এবং হরিদাস ঠাকুর শ্রীবাস পণ্ডিত প্রভৃতির স্থানে বলতে লাগলেন আমার মনে হয় এ নবদ্বীপ পুরে নিশ্চয় কোন মহাপুরুষ আগমন করেছেন আপনারা তাকে অনুসন্ধান করুন। প্রভুর এ আজ্ঞা পেয়ে ভক্তগণ স্বপ্নদৃষ্ট পুরুষের সন্ধানে বেরিয়ে চতুদিকে সন্ধান করতে লাগলেন। কিন্তু কোথাও সন্ধান পেলেন না, ফিরে এলেন প্রভুর কাছে। প্রভু বললেন স্বপ্ন কথা মিথ্যা নয় নিশ্চয়ই কোন স্থানে আছে, এবার প্রভু স্বয়ং অনুসন্ধান করতে চললেন। ভক্ত গণ পশ্চাদ অনুসরণ করলেন। মহাপ্রভু সােজাসজি ঠিক শ্রীনন্দন আচার্যের গৃহে উপস্থিত হলেন দেখলেন শ্রীনন্দন আচায্যের গৃহ-বারান্দায় দিব্য আসনে এক মহাপুরুষরতন ধ্যানাবিষ্ট ভাবে উপবিষ্ট আছেন। সকলে অবাক মহাপ্রভু বহু কাল পরে প্রাণের প্রিয়তম জনকে দর্শন করে কিছুক্ষণ অপলক নয়নে দাড়িয়ে রইলেন, নিত্যানন্দ প্রভুও প্রাণের দেবতাকে দীর্ঘকাল পরে দেখে পলকশূন্য ভাবে দেখতে লাগলেন কি আশ্চর্য মিলন নয়নে নয়নে যেন দুহে দুহার রূপ পানে বিভাের। এমন সময় বাস পণ্ডিত ভাগবতের একটি শ্রীকৃষ্ণের রূপ বর্ণনাত্মক শ্লোক সুস্বরে গান আরম্ভ করলেন। তা শুনে শ্রীনিত্যানন্দ প্রেমে হুঙ্কার পূর্বক ধরাতলে গড়াগড়ি দিতে লাগলেন। তার নয়ন জলে ভূতল সিক্ত হতে লাগল । সেই প্রেম দর্শনে শ্রীগৌরসুন্দর আর স্থির থাকতে পারলেন না তিনিও কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে প্রেমাশ্রুপাত করতে করতে নিত্যানন্দকে জড়িয়ে ধরলেন এবং কোলে তুলে নিলেন। সে কি মধুর মিলন দৃশ্য, দুহার নয়ন জলে দুই জন সিক্ত হচ্ছেন ; ভক্তগণ তৎকালে ঘন ঘন হরি ধ্বনি করতে লাগলেন।
আজ শ্রীগৌর নিত্যানন্দের মিলন হল। তারপর মহাপ্রভু নিত্যানন্দকে নিয়ে ভক্তগণ সঙ্গে মহানন্দে শ্রীবাস অঙ্গনে আগমন করলেন এবং কিছুক্ষণ নৃত্যকীর্তন করবার পর মহাপ্রভু নির্দেশ দিলেন শ্রীনিত্যানন্দ শ্রীবাস স্থানে অবস্থান করবেন । শ্রীবাস পণ্ডিত প্রভুর আজ্ঞায় নিত্যানন্দকে সাক্ষাৎ ঈশ্বর মানে সেবা করা লাগলেন। শ্রীবাসের পত্নী মালিনী দেবীকে নিত্যানন্দ প্রভু জননীর ন্যায় ভাবতেন। মালিনী দেবীও নিত্যানন্দ প্রভুকে পুত্র প্রায় সেবা করতেন। একদিন এক অপূর্ব ঘটনা হল। মালিনী দেবী ভগবদ্ অৰ্চনের বাসন সমূহ মার্জন করছেন এমন সময় এক কাক উড়ে এসে ঠাকুরের ঘূত বাটীটি নিয়ে গেল। মালিনী দেবী হায় হায় করে উঠলেন এবং অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলেন। সে দুঃখ শ্রবণে নিত্যানন্দ প্রভু তৎক্ষণাৎ তথায় উপস্থিত হলেন এবং সমস্ত কারণ অবগত হলেন। তখন মালিনী দেবীকে বললেন মা! তুমি দুঃখ করনা আমি এক্ষণে ঐ বাটী এনে দেব এ কথা বলে তিনি কাককে আহ্বান করে বললেন রে কাক তুই শীঘ্র করে ঠাকুরের ঘূত বাটীটি এনে দে। নিত্যানন্দ-আদেশে কাকটি শীঘ্রই ঘৃত বাটীটি কোথা হতে এনে দিয়ে উড়ে গেল, সকলে দেখে অবাক। যে নিত্যানন্দ প্রভু ত্রিলােকের অধীশ্বর তার পক্ষে অসম্ভব কি ?
একদিন শ্রীগৌরসুন্দর নিত্যানন্দ প্রভুকে জিজ্ঞাসা করলেন হে শ্রীপাদ ! কাল পূণিমা তিথি ব্যাসপূজা দিবস, তুমি কোথায়
শ্ৰব্যাস পূজা করবে? তখন নিত্যানন্দ প্রভু শ্রীবাস পণ্ডিতের হাত ধরে বললেন এ বামনের ঘরে। শ্রীবাস পণ্ডিত ব্যাস পূজা মহােৎসবের সব আয়ােজন করলেন। অধিবাস দিবস সুসজ্জিত ব্যাস পূজা মণ্ডপে প্রাতঃকাল থেকেই কীর্তন আরম্ভ হল। নিয়ম করা হল ভক্ত ব্যতীত অঙ্গনে অন্য কোন লােক প্রবেশ করতে পারবে না। আরম্ভ হল গৌর নিতানন্দ দুই ভাইয়ের মহা নৃত্য সংকীর্তন। আজি গােলােকের হরি ভূলােকে নেমেছেন যুগধর্ম নামসংকীর্তন এবং স্বীয় ভক্তিরস মাধুর্য্য আস্বাদনর জন্য । মধ্যাহ্ন কালে বিশ্রাম করলেন, পুনঃ সন্ধ্যাকাল হতে মহাসংকীতন আরম্ভ হল প্রায় মধ্য রাত্র পর্যন্ত নৃত্য সংকীর্তন চলল । ভক্তগণ নিজ নিজ ভবনে চলে গেলেন মহাপ্রভু নিজ ভবনে এলেন নিত্যানন্দ প্রভু শ্রীবাস অঙ্গনে আছেন। কিছু রাত্র পর নিত্যানন্দ মহাভাবাবেশে হুঙ্কার করে উঠলেন এবং নিজ দণ্ডটি ভেঙ্গে ফেললেন ও কমণ্ডলুটি দূরে ফেললেন। পর দিবস প্রাতে সৰ্বান্তর্যামী প্রভু শীঘ্র শ্রীবাস অঙ্গনে এলেন এবং শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর মহাভাবাবেশের কথা শ্রবণ করলেন, তখন তিনি সেই ভাঙ্গা দণ্ডটি ও কমণ্ডলু নিয়ে গঙ্গামধ্যে বিসর্জন করলেন । মহাপ্রভু ভক্ত গণের কাছে জানালেন শ্রী নিত্যানন্দ মহাভাগবত নিত্যসিদ্ধ জন তার পক্ষে ত্রিগুণাত্মক বেদের নিমিত বর্ণাশ্রম চিহ্নাদি রক্ষা করবার কোন প্রয়ােজন করে না। নিত্যানন্দের সঙ্গে মহাপ্রভু গঙ্গা স্নানাদি করে শ্রীবাস অঙ্গনে ফিরে এলেন। শ্রীবাস পণ্ডিত দুই প্রভুকে নব বস্ত্রাদি পরিধান করতে দিলেন। আজ ব্যাস পূজা দিবস ভক্তগণ মহা সংকীর্তন আরম্ভ করলেন, সঙ্গে সঙ্গে মৃদঙ্গ মধুর বাদন হতে লাগল। শ্রাবাস অঙ্গনে যেন স্বয়ং আনন্দ মূর্তিমান অবতীর্ণ হয়েছেন, গগন, পবন, দুলােক ভূলােক ও গােলােক সেই আনন্দ সিন্ধুর হিল্লোলে নৃত্য করছে সকলেই সুখসিন্ধু সাগরে ডুবে গেছেন।
এদিকে শ্রীবাস পণ্ডিত প্রভুর ইঙ্গিতে একটি দিব্য সুগন্ধি মালা শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর হাতে দিলেন। শ্ৰীনিত্যানন্দ প্রভু সে মালাটি হাতে নিয়ে আনন্দে বিভাের চিত্তে চারিদিকে দৃষ্টিপাত করতে লাগলেন তারপর মহাপ্রভু বললেন শ্রীপাদ মালাটি ব্যাসের কণ্ঠে দিয়ে ব্যাস পূজা সুসম্পন্ন করুন। প্রভুর কথা শুনে শ্ৰীনিত্যানন্দ প্রভু হাস্য করতে করতে মালাটি গৌরসুন্দরের কণ্ঠে পরিয়ে দিলেন, তখন চতুর্দিকে ভক্তগণ মহা হরিধ্বনি করে উঠলেন। আকাশ থেকে দেবগণ ও দেবীগণ আনন্দে নৃত্য গীত সহ যেন পুষ্প বৃষ্টি করতে লাগলেন। এবার শ্রীগৌরসুন্দর নিত্যানন্দ প্রভুকে ষড়ভূজ দর্শন করালেন। নিত্যানন্দ প্রভু সে দিব স্বরূপ দর্শনে আনন্দে প্রেম মূর্ছা গেলেন। তখন শ্রীগৌরসুন্দর নিত্যানন্দের শ্রী অঙ্গ স্পর্শ করে বললেন, শ্রীপাদ তুমি স্থির হও, যে সংকীৰ্ত্তন প্রচারের জন্য তুমি অবতীর্ণ হয়েছ তা সিদ্ধ হল। তুমি প্রেমভক্তি ধনের ভাণ্ডারী ; তাহতাে তুমি যদি লােককে কিছু দাও তবেই তারা প্রেম লাভ করতে পারে। নিত্যানন্দ বাহ্য় দশা লাভ করে প্রেমে ক্রন্দন করতে লাগলেন তখন মহাপ্রভু সকলকে বললেন—আজ ব্যাস পূজা পূর্ণ হল ; তােমরা সকলে হরি কীৰ্ত্তন কর । একথা বলে দুই ভাই নৃত্য করতে লাগলেন, চারিদিকে ভক্তগণ কীত্তন করতে লাগলেন। মালিনী-দেবীর সঙ্গে শচী মাতা নিভৃতে বসে এ সকল লীলা দর্শন করতে লাগলেন। সংকীর্তন অন্তে শ্রীব্যাস পূজার প্রসাদ শ্রীবাস পণ্ডিত সমস্ত ভক্তগণকে বিতরণ করলেন শ্রীব্যাস পূজার পর একদিন গৗরসুন্দর শ্রীবাস পণ্ডিতের ভ্রাত। শ্রীরাম পণ্ডিতক শান্তিপুরে শ্রীঅদ্বৈত আচার্য্যের নিকট প্রেরণ করলেন। শ্রী রাম পন্ডিত শীঘ্র অদ্বৈত আচার্য্য ভবনে এলেন এবং নিত্যানন্দের আগমন বার্তা জানালেন। অদ্বৈত আচার্য শীঘ্রই শ্রীগৌরসুন্দর ও নিত্যানন্দের চরণ দর্শনে চললেন। গৌরসুন্দর অদ্বৈত আচার্যের মনোগত যেসব সংকলন তা বলতে লাগলেন। তৎশ্রবণে অনন্দে শ্রীগৌর-পাদপদ্ম-যুগল অর্চন করলেন। অনন্তর মহাপ্রভু ভগবদ মন্দিরে প্রবেশ পূৰ্ব্বক বিষ্ণু খটায় উপবেশন করলেন, নিত্যানন্দ প্রভু শিরে ছত্র ধারণ করলেন, অদ্বৈত প্রভু স্মৃতি পাঠ করতে লাগলেন, গদাধর পণ্ডিত তাম্বুল প্রদান ও শ্রীবাস চামর ব্যজন প্রভৃতি এরূপ ভাবে প্রত্যেক ভক্ত কিছুনা কিছু প্রভুর সেবা করতে লাগলেন।
একদিন মহাপ্রভু বাস পণ্ডিতকে নিত্যানন্দ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেন, শ্রীবাস পণ্ডিত বললেন শ্রীনিত্যানন্দ তােমারই দেহ ; তোমাদের উভয়ের মধ্যে কোন ভেদ আমি দেখি না বরং তােমাকে জানতে হলে নিতাইয়ের কৃপা সাপেক্ষ। গৌরসুন্দর শ্রীবাসের মুখে একথা শুনে আনন্দে বললেন শ্রীবাস নিত্যানন্দের প্রতি তােমার এতাদৃশ বিশ্বাস, আমি তােমাকে বর দান করছি তােমার গৃহে কোন দিন অন্ন বস্ত্রের অভাব হবে না। তোমার গৃহের সকলেই আমার প্রিয় হবে। আর একদিন শ্রীশচীমাতা এক অপূর্ব স্বপ্ন দর্শন করলেন—গৌর নিতাই সাক্ষাৎ ব্রজের কানাই বলাই । নিতাই শচীমাতাকে মা বলে আহ্বান করছেন, শচী মাতা রন্ধন করে নিতাইকে ভােজন করাছেন। প্রাতে এ শুভ-স্বপ্ন কথা শচীমাতা গৌর-সুন্দরকে জানালেন, প্রভূ বললেন জননী । তবে আজ নিত্যানন্দকে আমন্ত্রণ করে আমাদের ঘরে ভােজন করান হউক, শচী মাতা নিতাইকে আমন্ত্রণ করতে আদেশ দিলেন। শ্রীগৌরসুন্দর নিতাইকে আমন্ত্রণ করে ঘরে আনলেন, ভৃত্য ঈশান প্রভুদ্বয়ের পাদ ধৌত করে দিলেন।তারপর শচীমাতা নিমাই নিতাইকে ভােজনে বসালেন, দুই ভাই আনন্দে ভোজন করছেন, তখন শচীমাতা দেখছেন গৌর নিতাই ব্রজের কানাই বলাই রূপে যেন ভােজন করছেন। কিন্তু এ রহস্য শচীমাতা আর কাকে বললেন না।
অন্যদিবস মহাপ্রভু শ্রীবাস অঙ্গনে ভক্তগণ সমীপে নিত্যানন্দ তত্ত্ব বলতে লাগলেন--নিত্যানন্দ আমার প্রকাশ বিগ্রহ স্বরূপ আমা হতে কিছু মাত্র ভেদ নাই। আমি নিত্যানন্দ দ্বারা বিশ্বে প্রেম ভক্তি দান করব। এ বলে মহাপ্রভু স্বহস্তে নিত্যানন্দের অঙ্গে গন্ধ লেপন ও কণ্ঠে মাল্য প্রদানাদি পূর্বক স্তুতি করতে লাগলেন। পরিশেষে এক খণ্ড কৌপীন চেয়ে নিয়ে উহা খণ্ড খণ্ড পূর্বক ভক্ত-গণের হস্তে প্রদান করলেন এবং মন্তকে বন্ধন করতে আদেশ করলেন। তখনই ভক্তগণ সানন্দে হরিধ্বনি করতে করতে মস্তক বন্ধন করালেন। 'তার পর প্রভুর আদেশে ভক্তগণ নিত্যানন্দের চরণামৃত সকল পান করলেন। একদিন অকস্মাৎ গৌরসুন্দর নিত্যানন্দ ও হরিদাস ঠাকুরকে আহ্বান পূবক বলতে লাগলেন—হে নিত্যানন্দ, হে হরিদাস তােমরা আমার আদেশ শ্রবণ কর। উভয়ে বললেন হে দয়াময়! কি আদেশ আমাদের প্রতি কৃপা করে বলুন। প্রভু বললেন, আদেশ এই—তােমরা প্রতি ঘরে ঘরে যাও এবং এ ভিক্ষা কর—কি ভিক্ষা বল কৃষ্ণ ভজ কৃষ্ণ কর কৃষ্ণ শিক্ষা। মুখে কৃষ্ণ নাম কর, কৃষ্ণের চরণ আরাধনা কর ও ভক্তি সদাচার পালন কর। এ সমস্ত শিক্ষা ছাড়া অন্য কোন শিক্ষার কথা বলবে না। এটাই ভিক্ষা অন্য কোন ভিক্ষা নাই । এস্থলে বৃন্দাবন দাস সুন্দর বর্ণনা করেছেন-
শুন শুন নিত্যানন্দ শুন হরিদাস ।
সর্বত্র আমার আজ্ঞা করহ প্রকাশ ।
প্রতি ঘরে ঘরে গিয়া কর এই ভিক্ষা ।
বল কৃষ্ণ, ভজ কৃষ্ণ, কর কৃষ্ণ শিক্ষা।
ইহা বই আর না বলিব। বলাইবা !
‘দন অবসানে আসি আমারে কহিবা ।
( চৈঃ ভাঃ মধ্যঃ ৩৮১)
প্রভুর নির্দেশ মত নিত্যানন্দ ও শ্রীহরি দাস নদীয়া নগরের ঘরে ঘরে এরূপ ভাবে নাম প্রচার করতে লাগলেন অনেক লোক নানা প্রকার কটাক্ষ ও কুৎসা করতে লাগলেন। আবার অনেক সজ্জন ব্যক্তি তারা এ প্রচারটি উত্তম বলে প্রশংসা করতে লাগলেন। সে সময় নদীয়ার কোতয়ালের কাৰ্য করত জগাই মাধাই। তারা ভয়ঙ্কর পাপ ও মদ্য পানে সর্বদা বিভাের থাকত ব্রাহ্মণ কুলে জন্ম তাদের। একদিন গঙ্গা তটে দুই মহাপাপী মদ্যপানে বিভাের হয়ে পড়ে আছে দয়াল ঠাকুর নিত্যানন্দ মনে মনে বিচার করলেন এ দুই জনকে অবশ্যই উদ্ধার করতে হবে। নিত্যানন্দ তাদের সম্মুখে উপস্থিত হলেন এবং প্রভুর নির্দেশ জ্ঞাপন করলেন “বল কৃষ্ণ ভজ কৃষ্ণ কর কৃষ্ণ শিক্ষা”। দুই মাতাল নিত্যানন্দেৰ আদেশ শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল, আরক্ত নয়নে বলতে লাগল—তাের নাম কি ? নিত্যানন্দ প্রভু জবাব দিলেন নাম
অবধূত, জগাই মাধাই বলল- - তুই কি বলছিস্? নিত্যানন্দ – আমি হরি নাম করতে বলছি। সেকথা শুনে মাধাই ক্ষিপ্ত ভাবে বলল— শালা আমাদের প্রতি আবার উপদেশ ; বলে ভাঙ্গা হাঁড়ির টুকরা ছুড়ে মারল নিত্যানন্দের মাথায়। হাঁড়ির টুকরা আঘাতে মাথাদিয়ে দর দর করে রক্ত পড়তে লাগল , তথাপি নিত্যানন্দ প্রভু অনুনয় করে বলতে লাগলেন, আমায় মেরেছিস্ ত ভালই হয়েছে তােরা একবার হরি হরি বল হরি হরি বল । মাধাই পুনঃ মারতে উদ্যত হল, তখন জগাই মাধায়ের দুখানি হাত চেপে ধরল, বল ভাই! বিদেশী সন্ন্যাসী মেরে লাভ নেই। এদিকে ভক্তগণ মহাপ্রভুর কাছে এ সংবাদ জানালেন প্রভু তৎ শ্রবণ মাত্রই ভক্তগণসহ তথায় উপস্থিত হলেন এবং নিত্যানন্দের ললাটে রক্তের ধারা দেখে ক্রোধা-বিষ্ট হয়ে সুদর্শন চক্রকে আহ্বান করলেন । মহা তেজময় সুদর্শন তৎক্ষণাৎ তথায় উপস্থিত হলেন। দুই পৰ্প তা দেখে ভয়ে কম্পমান। নিত্যানন্দ প্রভু অমনি প্রভুর করপদ্ম ধরে বলতে লাগলেন-হে দয়াময় প্রভো ! ক্রোধ সম্বরণ কর, এ অবতার অস্ত্র ধারণের অবতার নহে, নাম প্রেমে পাপী উদ্ধারের আকতার। আমি অনুনয় করছি তুমি অস্ত্র ধরন, নামপ্রেমে দুই পাপীকে উদ্ধার কর। নিত্যানন্দের এরূপ মহাদয়ালুতার কথা শ্রবণে শ্রীগৌরসুন্দর দ্রবীভূত হলেন। সুদর্শনকে চলে যেতে বললেন। পর তিনি যখন শুনলেন মাধাই নিত্যান'দকে মরতে জগাই তাকে রক্ষা
করেছে, তখন করুণাময় প্রভু জগাইকে ডেকে বললেন, জগাই ! তুই আমার দিব্য রূপ দর্শন কর এ বলে প্রভু তাকে দিব্য চতুভূজ নারায়ণ স্বরূপ দর্শন করলেন। জগাই সে দিবা রূপ দর্শন করে প্রভুর চরণ তলে লুটিয়ে পড়ল এবং স্তুতি করতে লাগল । কিন্তু মাধাই কিছুই দেখতে পেল না। জগাই বলল আমরা দুই ভাই আমাকে যেমন দয়া করলে তেমনি মাধাইকে কর প্রভু বললেন নিত্যানন্দ আমার প্রাণ, যে নিত্যানন্দকে দ্রোহ করে আমি তাকে কৃপা করি না। মাধাই যদি নিতাইর চরণ ধরে অপরাধ ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে সেও প্রেম পাবে। তখন মাধাই নিত্যানন্দের শ্রীচরণ তলে লুটিয়ে পড়লেন, নিত্যানন্দ তাকে বক্ষে তুলে আলিঙ্গন করলেন, তখন ভক্তগণ চারি দিকে মহাহরিধ্বনিতে মুখরিত করতে লাগলেন। এরূপ পতিত পাবন নিত্যানন্দ জগাই মাধাই দুই মহা পাপীকে উদ্ধার করে পতিত পাবন নামের সার্থকতা
করলেন।
যখন মহাপ্রভু নদীয়: নগরে যুগধর্ম নাম সংকীর্তন প্রচার করছিলেন, তখন নদীয়ার শাসক সিরাজউদ্দীন মৌলানা ভাষণ বাধা প্রদান করল , ভক্তদের গৃহে প্রবেশ করে মুদঙ্গ প্রভৃতি ভেঙ্গে দিতে লাগল । সমস্থ কথা ভক্তগণ প্রভুর কাছে নিবেদন করলেন। তা শুনে মহাপ্রভু নিত্যানন্দ প্রভুর সঙ্গে পরামর্শ করে সমস্ত ভাণকে সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যায় এক বিরাট নগর সংকীর্তন বাহির কবুলেন ' শ্রীগৌর-নিত্যানন্দের অচিন্ত্য শক্তিতে কোথা থেকে সমাগম হল তা কেহ বুঝিতে পারলেন তাদের দিব্য রূপে যেমন দশদিক আলােকিত হয়ে উঠল, ভক্তগণেরও তদ্রুপ রূপের সঞ্চার হল । মহা সংকীত্তন রােল ত্রিলােক অতিক্রম করে যেন গােলোকে পেীছল। পরমানন্দময় শ্রীগৌর নিত্যানন্দ যেন সেই আনন্দ সিন্ধুকে উদ্বেলিত করে নদীয়া নগরীকে নিমজ্জমান করছেন । আবাল বৃদ্ধ বনিতা সেই প্রেম-বন্যায় ডুবে গেল । মহাসংকীৰ্ত্তনের দল ক্ৰমে সিরাজউদ্দীন মৌলানা কাজীর গৃহের দিকে চলতে লাগল । এবার কাজী এ সমস্ত বিভূতী দর্শন করে নিস্তব্ধ ভাবে গৃহে বসে রইল। যেন তার শক্তি সংকীর্তনে অপহৃত হয়েছে। অতঃপর গৌরহরি নিত্যানন্দ ও অদ্বৈত আচার্য প্রভৃতিকে সঙ্গে নিয়ে কাজীর গৃহেতে প্রবেশ করলেন এবং কাজীকে আহ্বান করলেন। বললেন—আজ আপনার নগরে যে মহাসংকীৰ্ত্তন হচ্ছে তাতে কেন বাধা দিচ্ছেন না। কাজী উত্তর করলেন হে গৌরহরি! আমি যেই দিবস ভক্তের গৃহে প্রবেশ করে মৃদঙ্গ ভেঙ্গে ছিলাম! সেই দিবসের রাত্রে এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখেছিলাম। কোন এক ভয়ঙ্কর নসিংহ মূৰ্ত্তি হুঙ্কার করে আমার বক্ষে আরােহণ করে বলেছিলেন এ মৃদঙ্গ খণ্ডে তোর বক্ষ বিদীর্ণ করব। আমি ভয়ে অনেক স্তব করতে থাকলে, তিনি বললেন তােকে আজ ক্ষমা করে যাচ্ছি। স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল রাত্র শেষ হল, সে অবধি আমি আর সংকীর্তনে বাধা দিই না। আমার মনে হয় তুমি সেই, ঈশ্বর ।হাপ্রভূ বললেন আমি সব দোষ ক্ষমা করব তুমি একবার হরিবােল বল, এটি যুগ ধর্মযুগের সকলের জন্য। কাজী সাহেব মহাপ্রভুর ও নিত্যানন্দের দর্শন স্পর্শনে ও বাণী শ্রবণে একেবারেই মুগ্ধ আত্মহারা হলেন। প্রভুর সঙ্গে হরিনাম গান করে চললেন। কাজীর উদ্ধার দর্শনে আনন্দে ভক্তগণ হরিধ্বনি করতে লাগলেন। কাজী মহাপ্রভুর একজন পরম ভক্ত হলেন। পরবর্তী কালে তিনি চাঁদ কাজী নামে খ্যাত হলেন।শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু মহাপ্রভুর যাবতীয় লীলার সহায়ক।
প্রভু যখন সমগ্র জীব জগতের উদ্ধারের জন্য সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন নিত্যানন্দ প্রভু তার সঙ্গী হলেন। প্রভুর সঙ্গে ক্ষেত্ৰ ধামে যাত্রা করলেন। ক্ষেত্র ধামে কিছু দিন মহাপ্রভুর সঙ্গে নিত্যানন্দ রইলেন এবং রথ যাত্রাদি দর্শন করলেন। তখন একদিন শ্রীগৌরসুন্দর নিভৃতে নিত্যানন্দ প্রভুকে ডেকে বলতে লাগলেন—আমরা দুইজন যদি পুরীতে অবস্থান করি তা হলে গৌড় দেশবাসী ভক্তগণের গতি কি হবে ? অতএব আপনি শীঘ্র গৌড় দেশে যাত্রা করুন, তথাকার ভক্তগণকে সুখী করুন। পাপী তাপী জীবগণকে উদ্ধার করুন।
আজ্ঞা পাই নিত্যানন্দচন্দ্র কত ক্ষণে।
চলিলেন গৌড় দেশে লই নিজগণে।
। চৈঃ 'ভাঃ ৩/৫/২৩ )
নিত্যানন্দ প্রভু রাম দাস, গদাধর দাস, রঘুনাথ বৈদ্য, দাস পণ্ডিত, পরনেশ্বরী দাস ও পুরন্দর পণ্ডির সঙ্গে নিয়ে গোঁড় দেশাভিমুখে যাত্রা করলেন। প্রথমে পানিহাটী গ্রামে শ্রীরাঘব পণ্ডিতের গৃহে আগমন করলেন । ক্ৰমে গৌড় দেশবাসী ভক্তগণ তথায় আগমন করলেন।নিত্যানন্দ প্রভু প্রতিদিন সংকীৰ্ত্তন মহােৎসব করতে লাগলেন। একদিন রাঘব পণ্ডিতকে বললেন আজ কদম্ব ফুলের মালা পরিধান করব। ভক্তগণ বললেন হে প্রভা এখন ত কদম্ব ফুলের সময় নয়, কোথায় পাব? নিত্যানন্দ প্রভু বললেন-দেখ বাগানে। ভক্তগণ বাগিচায় এলেন দেখলেন স্ত্রীরের গাছে কদম্ব ফুল সকল ফুটে আছে ।
জারের বৃক্ষে সব কদম্বের ফুল।
ফুটিয়া আছয়ে অতি পরম অতুল।
( চৈঃ ভাঃ ৩/৫/২৮২)
এক সময় নিত্যানন্দ প্রভুর অলঙ্কার পরিধান করতে ইচ্ছা হল। তৎক্ষণাৎ অলঙ্কার সকল উপস্থিত হল ।
তবে নিত্যানন্দ প্রভুর কত দিনে ।
অলঙ্কার পরিতে হইল ইচ্ছ। মনে।
ইচ্ছামাত্র সব অলঙ্কার সেই ক্ষণে ।
উপসন্ন আসিয়া হৈল বিদ্যমান।
। চৈঃ ভাঃ অন্তঃ ৫/৩৩৩-৩৩৪ )
পানিহাটী গ্রাম হতে কিছু দিন পরে নিত্যানন্দ প্রভু খড়দহ গ্রামে পুরন্দর পণ্ডিতের গৃহে আগমন করলেন। নিজজনগণও ক্রমে তথায় উপস্থিত হলেন, তথায় কিছু দিন কীৰ্ত্তন বিলাস করবার পর গঙ্গাতটে সপ্তগ্রামে গ্রামে বনিক শ্রেষ্ঠ শীউদ্ধারণ দত্তের গৃহে শুভ বিজয় করলেন।
বনিক ভারতে নিত্যানন্দ অবতার ।
বনিকেরে দিল। প্রেম ভক্তি অধিকার
চৈ ভা; অন্ত: ৫/৪৫৪।
শ্রীনিত্যানন্দ কিছু দিন বনিক কুলকে উদ্ধার করে শান্তিপুরে শ্রীঅদ্বৈত আচাৰ্য ভবনে আগমন করলেন।
দেখিয়া অদ্বৈত নিত্যানন্দের মুখ ।
হেন নাহি জানেন জন্মিল কোন সুখ ।
( চৈঃ ভা; অন্তঃ ৫/৫৭০ )
কয়েক দিন শ্রীনিত্যানন্দ শান্তিপুরে অবস্থানের পর শ্রীনবদ্বীপ মায়া পুরে শ্রীশচীমাতাকে দর্শনের জন্য আগমন করলেন।
তবে অদ্বৈতের স্থানে লয় অনুমতি।
নিত্যানন্দ আইলেন নবদ্বীপ প্রতি।
সেই মতে সর্বাদ্যে আইলা আই স্থানে।
আসি নমস্করিলেন আইর চরণে।
নিত্যানন্দ স্বরূপে দেখি শচী আই।
কি আনন্দ পাইলেন তার অন্ত নাই।
(চৈঃ ভাঃ অন্ত ৫/৪৯৬-৪৯৮)
কিছু দিন নিত্যানন্দ প্রভু নবদ্বীপ পুরে অবস্থান করে মহা সংকীৰ্ত্তন বিলাস করতে লাগলেন।
একসময় চোর দস্য, দলপতি এক ব্রাহ্মণ কুমার নিত্যানন্দের অঙ্গে বিবিধ অলঙ্কার দেখে তা হরণ করবার জন্য মনস্থ করল এক সঙ্গী চোর দস্যুগণকে আহ্বান করল। চোরগণ প্রথমদিনের রজনীতে এসে দেখল নিত্যানন্দের চতুষ্পর্শে বহু ভক্তগণ বসে সংকীৰ্ত্তন করছেন। দ্বিতীয় দিন পুনঃ এল, নিত্যানন্দের পার্শ্বে কাকেও না দেখে দস্যগণ অস্ত্র নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করল, যখনই প্রবিষ্ট হল তখনই সকলে অন্ধ হয়ে গেল আর ভয়ঙ্কর ঝড় বর্ষা
আরম্ভ হল, দস্যুগণ আর কোথায় যাবে সবে অন্ধ হয়ে গড় খাইয়ের মধ্যে পড়ে মহা কষ্ট দুঃখ ভােগ করতে লাগল। সারা রাত্রি এরূপে কেটে গেল, প্রাতঃকাল হল ঝড় বর্ষা থেমে গেল। তখন দস্যুগণ বুঝতে পারল এ সব নিত্যানন্দ প্রভুর প্রভাব, সকলে নিত্যানন্দ চরণে এসে স্তব করতে লাগল—
বৃক্ষ রক্ষ নিত্যানন্দ শ্রীবাল গােপাল।
রক্ষা কর প্রভু তুমি সর্ব জীব পাল।
*
এই
তুমি সে জীবের ক্ষম সব অপরাধ ।
পতিত জনেরে তুমি করহ প্রসাদ ।
(চৈঃ ভাঃ অন্ত: ৫/৬২৬-৬২৯)
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু এভাবে দীনহীন পাপী সকলকই প্রেম ভক্ত দান করেন। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু যখন পানিহাটী গ্রামে শ্রীরাঘব শণ্ডিত গৃহে অবস্থান করছিলেন সেই সময় হিরণ্য গােবর্ধন দাসের পুত্র শ্রীরঘুনাথ দাস শ্রীনিত্যানন্দ চরণে শরণাপন্ন হন। ত্যানন্দ প্রভু রঘুনাথ দাসকে নিকট টেনে এনে স্বীয় কোটি চন্দ্র সুশীতল শ্রীচরণ তার মস্তকে ধারণ করেন এবং বলেন তুমি আমার ভক্তগণকে চিড়াদধি ভােজন করাও। নিত্যানন্দ প্রভুর নির্দেশে রঘুনাথ দাস চিড়াদধি মহোৎসব অনুষ্ঠান করলেন। অদ্যাপি চিড়াদধি মহােৎসব পানিহাটীতে অনুষ্ঠিত অনন্তর নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপায় শ্রীরঘুনাথ দাসের সংসার বন্ধন থেকে উদ্ধার লাভ এবং শ্রীগৌরসুন্দরের শ্রীপাদ-পদ্ম লাভ হয়। শ্রীচৈতন্য লীলার ব্যাস বৃন্দাবন দাস বলেছেন-
নিত্যানন্দ প্রসাদে সে সকল সংসার।
অদ্যাপিং গায় শ্রীচৈতন্য অবতার।
(চৈঃ ভা; অন্ত; ৫/২২০ )
শ্ৰীল কবিরাজ গােস্বামী প্রভু বলেছেন-
শ্রীচৈতন্য-সেই কৃষ্ণ, নিত্যানন্দ-রাম।
নিত্যানন্দ পূর্ণ করে চৈতন্যের কাম ।।
নিত্যানন্দ মহিমা সিন্ধু অনন্ত অপার।
এক কণা স্পশি মাত্র, সে কৃপা তাহার ।।
( চৈঃ চঃ অন্ত; ৫/১৫৬ ১৫৭ )
শ্ৰীল নরােত্তম ঠাকুর মহাশয় গেয়েছেন।
নিতাই পদ কমল কোটি চন্দ্র সুশীতল,
যে ছায়ায় জগৎ জুড়ায় ।
হেন নিতাই বিনে ভাই রাধাকৃষ্ণ পাইতে নাই ,
দৃঢ় করি ধর নিতাইর পায় ।
সে সম্বন্ধ নাহি যার
বৃথা জন্ম গেল তার,
সেই পশু বড় দুরাচার ।
নিতাই না বলিল মুখে মজিল সংসার সুখে
বিদ্যাকুলে কি করিবে তার ।
অহঙ্কারে মত্ত হ এ নিতাই পদ পাসিরিয়া,
অসত্যেরে সত্য করি মানি।
নিতাইয়ের করুণা হবে, ব্রজে রাধাকৃষ্ণ পাবে
ধর নিতাই চরণ দু খানি ।
নিতাই চরণ সত্য, তাহার সেবক নিত্য
নিতাই পদ সদা কর আশ ।
নরােত্তম বড় দুঃখী নিতাই মােরে কর সুখী,
রাখ রাঙ্গাচরুণের পাশ ।

নিত্যানন্দ প্রভুর পার্ষদ যারা ব্ৰজের সখা বলে উক্ত হয়েছেন তাঁরাই দ্বাদশ গােপাল নামে খ্যাত।
১। অভিরাম ঠাকুর শ্রীপাট খানাকুল কৃষ্ণনগর।
২। সুন্দরানন্দ ঠাকুর শ্রীপাট যশােহর জেলার অন্তর্গত মহেশপুর । কমলাকর পিপ্পলাই পাট মাহেশ,
৪। গৌরী দাস পণ্ডিত শ্রীপাট অম্বিকা কালনা,
৫। শ্রীপরমেশ্বরী দাস শ্রীপাট আটপুর।
৬। শ্ৰীধনঞ্জয় পণ্ডিত শ্রীপাট কাটোয়ার নিকট শীতল গ্রাম।
৭। মহেশ পণ্ডিত শ্রীপাট পাল পাড়া, চাকদহ,
৮। পুরুষােত্তম পণ্ডিত, শ্রীপাট সুখসাগর,
১। শ্রীকালা কৃষ্ণ দাস পাট আকাই হাট গ্রাম,
১। শ্রীপুরুষােত্তম শ্রীপাট চালুড় গ্রাম,
১১। উদ্ধারণ ঠাকুর শ্রীপাট সপ্ত গ্রাম,
১২। শ্রীধর শ্রীপাট (অজ্ঞাত)

শ্রীচৈতন্য লীলার ব্যাস শ্ৰীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর নিত্যানন্দ প্রভুর শেষ ভৃত্য বলে পরিচিত। এ পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত ভাবে নিত্যানন্দ চরিত সমাপ্ত হল।জয় পতিত পাবন দয়াল ঠাকুর সপার্ষদ শ্ৰীশ্ৰীল নিত্যানন্দ প্রভু কি জয়।




SHARE

Milan Tomic

Hi. I’m Designer of Blog Magic. I’m CEO/Founder of ThemeXpose. I’m Creative Art Director, Web Designer, UI/UX Designer, Interaction Designer, Industrial Designer, Web Developer, Business Enthusiast, StartUp Enthusiast, Speaker, Writer and Photographer. Inspired to make things looks better.

  • Image
  • Image
  • Image
  • Image
  • Image
    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment