শ্রীভগবানুবাচ
পরং ভূয়ঃ প্রবক্ষ্যামি জ্ঞানানাং জ্ঞানমুত্তমম্।
যজজ্ঞাত্বা মুনয়ঃ সর্বে পরাং সিদ্ধিমিতাে গতাঃ ॥১॥
অনুবাদ—শ্রীভগবান্ কহিলেন,সকল জ্ঞান-সাধন মধ্যে অতি উত্তম এক জ্ঞান-উপদেশ তােমাকে বলিব, যাহা অবগত হইয়া মুনিগণ এই দেহবন্ধন হইতে পরা মুক্তি লাভ করিয়া থাকেন ॥ ১॥
ইদং জ্ঞানমুপাশ্ৰিত্য মম সাধৰ্মমাগতাঃ।
সর্গেইপি নােপজয়ন্তে প্রলয়ে ন ব্যথন্তি চ ॥ ২॥
অনুবাদ—এই জ্ঞানকে আশ্রয় পূৰ্ব্বক মুনিগণ আমার স্বারূপ্যলক্ষণা মুক্তি প্রাপ্ত হইয়া, সৃষ্টিকালে জন্মগ্রহণ করেন না, বা প্রলয়কালেও মৃত্যুযন্ত্রণা লাভ করেন না ॥ ২ ॥
মম যােনির্মহব্রহ্ম তস্মিন্ গর্ভং দধাম্যহম্।
সম্ভবঃ সর্বভূতানাং তত ভবতি ভারত ॥৩ ৷৷
অনুবাদ—হে ভারত! প্রকৃতি আমার যােনি বা গর্ভাধানস্থান, আমি তাহাতে তটস্থপ্রভাবরূপ জীব-বীজকে আধান করি, তাহা হইতেই সমস্ত জীবের জন্ম হয় ॥ ৩॥
সর্বষােনিযু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যায়।
তাসাং ব্রহ্ম মহম্যােনিরহং বীজপ্রদঃ পি ॥ ৪॥
অনুবাদ—হে কৌন্তেয় ! দেবতির্যকাদি সকল যােনিতে যে সকল মূর্তি উদ্ভূত হয়, মহৎ ব্রহ্মই অর্থাৎ প্রকৃতি তাহাদের যােনি অর্থাৎ জননীস্বরূপা এবং আমি বীজ-আধানকর্তা পিতৃম্বরূপ ॥৪॥
সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ
নিবন্তি মহাবাহাে দেহে দেহিনমব্যয় ॥৫॥
অনুবাদ—হে মহাবাহ! জড়া প্রকৃতি হইতে জাত সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ এই গুণত্রয় দেহমধ্যে অবস্থিত নির্বিকার দেহী জীবকে সুখ-দুঃখাদি ভােগে আবদ্ধ করে ॥৫॥
তত্র সত্ত্বং নির্মলত্বাৎ প্রকাশকমনাময়।
সুখসজেন বাতি জ্ঞানসজেন চানঘ ॥৬॥
অনুবাদ—হে নিস্পাপ ! সেই গুণত্রয়ের মধ্যে নির্মলতা-হেতু প্রকাশক, নিরুপদ্রব বা শান্ত সত্ত্বগুণ, দেহী জীবকে জ্ঞান ও সুখের সঙ্গ-দ্বারা বদ্ধ করে ॥৬॥
রজা রাগাত্মকং বিদ্ধি তৃষ্ণাসঙ্গসমুদ্ভব।
তন্নিবপ্নাতি কৌন্তেয় কর্মসজেন দেহিন। ৭।
অনুবাদ—হে কৌন্তেয় ! রজোগুণকে অনুয়াগাত্মক, তৃষ্ণা ও আসক্তি হইতে উৎপন্ন বলিয়া জানিবে, সেই রজোগুণ দেহী জীবকে কর্মাসক্তিতে আবদ্ধ করে ॥৭॥
তমত্ত্বজ্ঞানজং বিদ্ধি মােহনং সর্বদেহিনা।
প্রমাদালস্তনিদ্রাভিস্তম্নিবতি ভারত ॥৮॥
অনুবাদ—হে ভারত! তমােগুণকে অজ্ঞানজাত সৰ্বজীবের মােহন কারী জানিবে, সেই তমােগুণ জীবকে প্রমাদ, আলস্য ও নিদ্রার দ্বারা আবদ্ধ করে ॥৮॥
সত্ত্বং সুখে সঞ্জয়তি রজঃ কর্মণি ভারত।
জ্ঞানমাৰ্বত্য তু তমঃ প্রমাদে সঞ্জয়ত্যুত ॥৯॥
অনুবাদ—হে ভারত! সত্ত্বগুণ জীবকে সুখে আসক্ত করে, রজোগুণ কর্মে আবদ্ধ করে, আর তমােণ জ্ঞানকে আবরণ করিয়া প্রমাদের সহিত সংশ্লিষ্ট করে ॥৯॥
রজমশ্চাভিভূয় সত্ত্বং ভবতি ভারত।
রজঃ সত্ত্বং তমশ্চৈব তমঃ সত্ত্বং রজস্তথা ॥১০॥
অনুবাদ—হে ভারত! সত্ত্বগুণ, রজঃ ও তমঃকে পরাভূত করিয়া উদ্ভূত, রজো গুণ, সত্ত্ব ও তমােণ্ডণকে অভিভূত করিয়া উদ্ভূত, তদ্রুপ তমােগুণ, সত্ব ও রজোকে পরাজিত করিয়া প্রাধান্য লাভ করে ॥১০॥
সৰ্ব্বদ্বারেষু দেহেহস্মি প্রকাশ উপজায়তে।
জ্ঞানং যদা তদা বিদ্যাদ্বিবৃদ্ধং সত্ত্বমিত্যুত ॥১১॥
অনুবাদ—যখন এই দেহে শ্রোত্রাদি-জ্ঞানেন্দ্রিয়দ্বারে বিষয়ের স্বরূপ প্রকাশরূপ জ্ঞান উৎপন্ন হয়, তখন সত্ত্বগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়াছে জানিবে এবং সুখ-প্রকাশরূপ চিহ্ন দ্বারাও সত্ত্বের বৃদ্ধি জানিবে ॥ ১১॥
লােভঃ প্রবৃত্তিরারম্ভ কৰ্ম্মণামশমঃ স্পৃহা।
রজসেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে ভরতভ॥ ১২॥
অনুবাদ—হে ভরতভ! লােভ, নানাযত্নপরতা, কৰ্ম্মসমূহে উদ্যম, বিষয়ভােগে অনিবৃত্তি, ভােগাভিলাষ এই সকল রজোগুণ বর্ধিত হইলে উৎপন্ন হয় ॥১২॥
অপ্রকাশােহপ্রবৃত্তি প্রমাদো মােহ এব চ।
তমস্তােনি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে কুরুনন্দন ॥ ১৩॥
অনুবাদ—হে কুরুবংশজাত কুরুনন্দন! তমােগুণ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইলে, অপ্রকাশ, অপ্রবৃত্তি, প্রমাদ ও মােহ প্রভৃতি এই সকল উৎপন্ন হয় ॥ ১৩॥যদা সত্ত্বে প্রবৃদ্ধে তু প্রলয়ং যাতি দেহভৃৎ।
তদোত্তমবিদাং লােকানমলা প্রতিপদ্যতে ॥১৪॥
অনুবাদ—আর যখন সত্ত্বগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত কালে দেহী-জীব দেহত্যাগ করে, তখন হিরণ্যগর্ভাদি পাসকদিগের সুখপ্রদ লােকসমূহ লাভ করে ॥ ১৪॥
রজসি প্রলয়ং গত্বা কৰ্ম্মসঙ্গিযু জায়তে।
তথা প্ৰলীনস্তমসি মূঢ়যােনিযু জায়তে ॥ ১৫॥
অনুবাদ—রজোগুণ বৃদ্ধি প্রাপ্তকালে মৃত্যু হইলে জীব কর্মাসক্ত মনুষ্য লােক মধ্যে জন্ম গ্রহণ করে এবং তমােগুণ বৃদ্ধিকালে মৃত্যু হইলে পশ্যাদি যােনিতে উৎপন্ন হয় ॥ ১৫ ॥কর্মণঃ সুকৃতস্যাঃ সাত্ত্বিকং নিৰ্ম্মলং ফলম্ ।
রজন্তু ফলং দুঃখমজ্ঞানং তমসঃ ফলম্ ৷৷ ১৬॥
অনুবাদ—সুকৃত—সাত্ত্বিক কর্মের নির্মল সুখময় ফল, আর রাজসিক কর্মের ফল দুঃখময় এবং তামসিক কর্মের ফল অজ্ঞান বা অচেতনময় কথিত হয় ॥১৬॥সত্ত্বাৎ সংজায়তে জ্ঞানং রজলসা লােভ এব চ
প্রমাদমােহৌ তমসলা ভবতােইজ্ঞানমেব চ ॥১৭॥
অনুবাদ—সত্ত্বগুণ হইতে জ্ঞান, রজোগুণ হইতে লােভ এবং তমােণ হইতে প্রমাদ, মােহ ও অজ্ঞান উৎপন্ন হইয়া থাকে ॥১৭॥
উৰ্দ্ধং গচ্ছত্তি সত্ত্ব মধ্যে তিষ্ঠন্তি রাজসাঃ।
জঘন্যগুণবৃত্তিস্থা অবধা গচ্ছত্তি তামসাঃ॥ ১৮ ॥
অনুবাদ—সত্ত্বগুণস্থ জনগণ স্বৰ্গাদি উৰ্দ্ধলােকসমূহে গমন করিয়া থাকে, রজোগুণান্বিত লােকেরা নরলােকে স্থানলাভ করে, এবং নিকৃষ্ট তমােণ্ডণযুক্ত ব্যক্তিগণ নরকাদি অধোলােকে গমন করে। ১৮নান্যং গুণেভ্যঃ কর্তারং যদা ষ্টাপতি।
গুণেভ্যশ্চ পরং বেত্তি মম্ভাবং সােহধিগচ্ছতি ॥ ১৯॥
অনুবাদ—যখন জীব গুণত্রয় হইতে পৃথক্ অন্য কর্তাকে দর্শন করেন না এবং গুণত্রয়ের অতীত অন্তর্যামী আত্মাকে অবগত হন, তখন তিনি আমাতে ভাব অর্থাৎ ভক্তি লাভ করিয়া থাকেন ॥ ১৯॥
গুণানেনতীত্য ত্ৰী দেহী দেহসমুদ্ভবা।
জম্মমৃত্যুজরাদুঃখের্বিমুক্তোমৃতমশ্ন তে ॥২০।
অনুবাদ—দেহবিশিষ্ট জীব দেহােৎপাদক এই ত্রিগুণ অতিক্রম করিয়া জন্ম, মৃত্যু, জরা ও দুঃখ হইতে বিমুক্ত হইয়া, অমৃত অর্থাৎ পরমানন্দ প্রাপ্ত হন। ২০
অর্জুন উবাচ
কৈর্লিঙ্গৈস্ত্রী গুণানেনতীতত ভবতি প্রভাে।
কিমাচারঃ কথং চৈতাংস্ত্রী গুণানভিবৰ্ত্ততে ॥২১॥
অনুবাদ—অর্জুন বলিলেন,-হে প্রভাে! এই ত্রিগুণ-অতিক্রমকারী ব্যক্তি কি কি চিহ্ন দ্বারা জ্ঞাত হন্ ? তিনি কিরূপ আচরণ করেন ? এবং কি উপায়ে তিনি এই ত্রিগুণকে অতিক্রম করেন ? ॥ ২১॥
শ্রীভগবানুবাচ
প্রকাশঞ্চ প্রবৃত্তিঞ্চ মােহমেব চ পাণ্ডব।
ন দ্বেষ্টি সংপ্রবৃত্তানি ন নিবৃত্তানি কাঙক্ষতি৷২২।
উদাসীনবদাসীননা গুণেৰ্যো ন বিচাল্যতে।
গুণ বৰ্ত্তন্ত ইত্যেবং যােইবতিষ্ঠতি নেঙ্গতে॥২৩॥
সমদুঃখসুখঃ স্বস্থঃ সমলােষ্ট্ৰাম্মকাঞ্চন।
তুল্যপ্রিয়াপ্রিয়াে ধীরস্তুল্যনিন্দাত্মসংস্তুতিঃ ॥ ২৪॥
মানাপমানয়ােস্তলস্তল্যো মিত্রারিপয়ােঃ।
সর্বারন্থপরিত্যাগী গুণাতীতঃ স উচ্যতে॥২৫॥
অনুবাদ—শ্রীভগবান্ বলিলেন,—হে পাণ্ডব ! যিনি প্রকাশ, প্রবৃত্তি ও মােহ স্বভাবতঃ উদিত হইলে দ্বেষ করেন না, বা নিবৃত্ত হইলেও আকাঙ্ক্ষা করেন না, যিনি উদাসীনের ন্যায় অবস্থিত থাকিয়া গুণত্রয়ের কার্যাদি দ্বারা বিচলিত হন না, ত্রিগুণ স্ব-স্ব কাৰ্য্য করিতেছে—এইরূপ বিচারে অবস্থিত । থাকেন, তারা চঞ্চলতা প্রাপ্ত হন না, যিনি সুখদুঃখে সমভাববিশিষ্ট, লােষ্ট্র, প্রস্তর এবং কাঞ্চনে তুল্যজ্ঞানযুক্ত, প্রিয় ও অপ্রিয়-বিষয়ে সমভাবাপন্ন, ধীমান্, নিজের নিন্দা ও প্রশংসায় তুল্যভাবযুক্ত, মান ও অপমানে, শত্রু ও মিত্রপক্ষে তুল্যভাববিশিষ্ট, সৰ্ব্ব প্রকার কর্মোদ্যম পরিত্যাগ করিয়াছেন, তিনিই গুণাতীত বলিয়া কথিত হন ॥ ২২-২৫।
মাঞ্চ যােইব্যভিচারেণ ভক্তিযােগেন সেবতে।
স গুণা সমতীত্যৈ ব্ৰহ্মভুয়ায় কল্পতে ॥২৬॥
অনুবাদ—যিনি আমাকেই ঐকান্তিক ভক্তিযােগ-সহকারে সেবা করেন, তিনি এই গুণত্রয়কে অতিক্রম করিয়া ব্ৰহ্মানুভবের যােগ্য হন ॥২৬॥
ব্ৰহ্মণণা হি প্রতিষ্ঠাহমমৃতস্যাৰ্যয়স্য চ।
শাশ্বতস্য চ ধর্মস্য সুখস্যৈকান্তিকস্য চ ॥২৭॥
অনুবাদ—কারণ আমি ব্রহ্মের (নিৰ্বিশেষ ) প্রতিষ্ঠা বা আশ্রয়, অব্যয় মােক্ষের, সনাতন ধর্মের ও ঐকান্তিক সুখের আমিই একমাত্র আশ্রয় ॥ ২৭॥
0 comments:
Post a Comment