শ্রীসনাতন গোস্বামী

শ্রীসনাতন গোস্বামী শ্রীমদ্ জীব গোস্বামীর লঘু বৈষ্ণব তোষণীতে স্বীয় বংশ গৌত্রাদির পরিচয় প্রদান করেছেন তাদের আদি বংশধর কর্ণাটক দেশাধিপতি ভরদ্বাজ-গোত্রীয় যজুবেদী ব্রাহ্মণ শ্রীসা অগগুরু ছিলেন। তাঁর পুত্র শ্রীঅনিরুদ্ধ দেব। যুদ্ধ ও বিদ্যাশাস্ত্রে পারঙ্গত ছিলেন শ্রীহরিহর দেব। তিনি বলপূর্ব্বক শ্রীরূপেশ্বর দেবের রাজ্য গ্রহণ করেন। তখন রূপেশ্বর দেব আটটি অশ্ব নিয়ে পত্নীর সঙ্গে পৌলভ্যদেশে গমন করেন। সে দেশের অধিপতি শ্রীশেখরেশ্বরের সঙ্গে তাঁর মিত্রতা হয়। শ্রীরূপেশ্বর দেবের পুত্র শ্রীপদ্মনাভদেব। তিনি নিখিল বেদশাস্ত্রে পন্ডিত ছিলেন। শ্রীপদ্মনাভদের শেখরেশ্বরের রাজ্য থেকে গঙ্গাতটে নৈহাটিতে এসে বসবাস করতে লাগলেন। তাঁর আট কন্যা ও পাঁচটি পুত্র। পুত্রগণ সকলে বেদশাস্ত্রে পারঙ্গত ছিলেন। তাঁদের নাম পুরুষোত্তম, জগন্নাথ, নারায়ণ, মুরারি ও মুকুন্দদেব। শ্রীমুকুন্দদেব জ্ঞাতিগণের দ্বারা উৎপীড়িত হয়ে বালা চন্দ্ৰ দ্বীপে এসে বাসগৃহ নির্মাণ করেন। তিনি যশোরে ও ফতেয়াবাদে যজমান গৃহে সৰ্ব্বদা যাতায়াত করতেন বলে তথায়ও বাসগৃহ নির্মাণ করে রেখেছিলেন। শ্রীমুকুন্দ দেবের পুত্র শ্রীকুমার দেব। তাঁর অনেকগুলি সন্তান ছিল। তাঁদের মধ্যে শ্রীসনাতন, শ্রীরূপ ও শ্রীঅনুপম বা বল্লভ এঁরা পরম ভাগবত ছিলেন।” শ্রীসনাতন গোস্বামীর জন্ম খৃষ্টাব্দ ১৪৮৮, শকাব্দ ১৪১০ (গৌড়ীয় ২১।২-৪ )। শ্রীরূপ গোস্বামীর জন্ম খৃষ্টাব্দ ১৪৯৩, শকাব্দ ১৪১৫। এঁরা রাজধানী গৌড়ের নিকটে সাকুর্মা নামক এক ক্ষুদ্র পল্লীতে মাতুল গৃহে থেকে
পড়াশুনা করতেন। গৌড়ের বাদশা হুসেন সাহ সজ্জনের মুখে শ্রীরূপ ও সনাতনের মহিমা শুনে তাঁদিগকে মন্ত্রী-পদে নিযুক্ত করলেন। অনিচ্ছুক হলেও যবন-রাজের ভয়ে তারা কার্য্য করতে লাগলেন। বাদশা তাঁদিগকে প্রচুর সম্পত্তি দান করেন। শ্রীরূপ সনাতন গৌড়ের রাজধানী রামকেলিতে বাস করতে লাগলেন। দেশ বিদেশ থেকে বড় বড় পন্ডিত ব্রাহ্মণ তাঁদের গৃহে আগমন করতেন। কর্ণাটক থেকে ব্রাহ্মণগণ এলে তাঁদের থাকার বিশেষ ব্যবস্থা তাঁরা করতেন। গঙ্গার নিকট তাদের বসতবাটী স্থাপিত হওয়ায় অদ্যাপি ঐ গ্রাম ভট্টবাটী নামে খ্যাত। নবদ্বীপ থেকে ব্রাহ্মণ পন্ডিতগণ রামকেলিতে এলে শ্রীরূপ সনাতন তাঁদের বিশেষ সেবা করতেন। শ্রীরূপ সনাতনের অধ্যাপক ছিলেন—গৌড়ের অলঙ্কার-স্বরূপ শ্রীবিদ্যাভূষণ পাদ। তাঁদের দর্শন শাস্ত্রের গুরু-নবদ্বীপের সার্ব্বভৌমের ভ্রাতা বিদ্যাবাচস্পতি। এ ছাড়া তাঁদের শিক্ষক ছিলেন—শ্রীপরমানন্দ ভট্টাচার্য্য, শ্রীরামপদ ভদ্রপাদ প্রভৃতি। ভাগবতে দশম-টিপ্পনীতে এঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। শ্রীসনাতন, শ্রীরূপ ও শ্রীঅনুপম তিন ভাই শৈশব কাল থেকে ভগবদ ভক্তিভাব সম্পন্ন ছিলেন। তাঁরা গৃহ সন্নিকটে বৃন্দাবন স্মৃতিতে সুরম্য তমাল, কদম্ব, যুথিকা ও তুলসী কানন তৈরী করেন ও তার মধ্যে রাধাকুন্ড এবং শ্যামকুন্ড নামক সরোবর খনন করে নিত্য শ্রীমদনমোহনদেবের সেবায় নিমগ্ন থাকতেন। তাঁরা লোক-পরম্পরায় শ্রীগৌরসুন্দরের চরিতাবলী শুনে তাঁর দর্শনের জন্য উৎকণ্ঠিত হতেন। কিন্তু অন্তরে কে যেন বলত – তোরা ধৈর্য্য ধারণ কর। এখানেই সেই পতিতপাবন ঠাকুরের দর্শন পাবি। শ্রীসনাতন গোস্বামীর বয়স তখন অল্প। একদিন রাত্রে স্বপ্ন দেখছেন— এক ব্রাহ্মণ তাঁকে একখানি শ্রীমদ্ভাগবত প্রদান করছেন। শ্রীসনাতন ভাগবত পেয়ে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন স্বপ্ন ভঙ্গ হল। তিনি কা'কেও দেখতে
পেলেন না; বড় দুঃখিত হলেন। সকাল বেলা স্নান পূজাদি সমাপ্ত করে তিনি বসেছেন। এমন সময় এক ব্রাহ্মণ একখানি ভাগবত নিয়ে তাঁর কাছে উপস্থিত হলেন এবং বললেন—তুমি এই ভাগবত খানি নাও ও নিত্য অধ্যয়ন কর সৰ্ব্বসিদ্ধি হবে। এ কথা বলে ব্রাহ্মণ তাঁকে ভাগবত দিয়ে চলে গেলেন। যথার্থ ভাগবত প্রাপ্তিতে শ্রীসনাতনের আনন্দের সীমা রইল না। সে দিন থেকে শ্রীসনাতন শ্রীমদ্ভাগবত শাস্ত্র একমাত্র সর্ব্বশাস্ত্র-সার জ্ঞানে অধ্যয়ন করতে লাগলেন। মদেকবন্ধো মৎসঙ্গিন মদ্‌গুরো মন্মহাধন। মন্নিস্তারক মদ্ভাগ্য মদানন্দ নমোহস্তুতে।। - (শ্রীমদ্ভাগবত মহিমাস্তোত্রম্) শ্রীসনাতন গোস্বামী শ্রীমদ্ভাগবত শাস্ত্রের বন্দনা করে বলছেন—আমার একমাত্র সঙ্গী, একমাত্র বন্ধু, গুরু, মহাধন, আমার নিস্তারকারী, আমার ভাগ্যস্বরূপ, আনন্দ-স্বরূপ, তোমাকে নমস্কার । নদীয়ার প্রাণধন-শ্রীগৌরহরি সন্ন্যাসী হয়ে পুরী ধামে গেছেন এ সংবাদ শুনে শ্রীসনাতন ও শ্রীরূপ মূর্ছিত হলেন। এ জীবনে আর তাঁর দর্শন পাবেন না বলে দুই ভাই কত খেদ করতে লাগলেন। এমন সময় দৈববাণী হল “তোমরা খেদ ক’র না। করুণাময় গৌরহরি শীঘ্র আসছেন।” দৈববাণী শুনে তাঁরা আশ্বস্ত হলেন । পাঁচ বছর সুখে পুরীতে অবস্থান করে জননী ও গঙ্গা দর্শনের জন্য মহাপ্রভু গৌড় দেশে আগমন করলেন। ভক্তগণের সুখের সীমা রইল না; বহুদিন পরে গৌরকে পেয়ে শ্রীশচীমাতা সুখে দেহ-স্মৃতি-রহিত হলেন। তিনি কয়েকদিন রন্ধন করে গৌরসুন্দরকে খাওয়ালেন। প্রভু শান্তিপুরে শ্রীঅদ্বৈত আচাৰ্য্য ভবনে কয়েক দিন সুখে থাকবার পর রামকেলি গ্রামে এলেন।
ঐছে চলি 'আইলা প্রভু' রামকেলি গ্রাম। গৌড়ের নিকট গ্রাম অতি অনুপাম ।। যাঁহা নৃত্য করে প্রভু প্রেমে অচেতন। কোটি কোটি লোক আইসে দেখিতে চরণ।। (চৈঃ চঃ মধ্যঃ ১। ১৬৬-১৬৭ ) মহাপ্রভুর প্রভাব শুনে বাদশা হুসেন সাহ বলতে লাগলেন বিনা দানে এত লোক যাঁর পাছে হয়। সেই তো গোসাঞী ইহা জানিহ নিশ্চয়। কাজী, যবন ইহার না করিহ হিংসন। আপন-ইচ্ছায় বুলুন যাঁহা উহার মন।। - (চৈঃ চঃ মধ্যঃ ১। ১৬৯-১৭০) মহাপ্রভুর শুভাগমনে রামকেলি গ্রাম আনন্দে মুখরিত হল। চতুৰ্দ্দিক থেকে লোক মহাপ্রভুকে দেখতে আসতে লাগলেন। কেশব ছত্রী বাদশার বিশিষ্ট প্রতিনিধি । বাদশা তাঁকে প্রভুর সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন। কেশব ছত্রী বললেন—হাঁ শুনেছি একজন ভিখারী সন্ন্যাসী এসেছেন; তাঁর সঙ্গে দু'চারজন লোক আছে। বাদশা বললেন – আপনি কি বলছেন ? সহস্র সহস্র লোক তাঁর সঙ্গে চলেছে। এ কথা শুনে কেশব ছত্রী একটু হাস্য করলেন। ছত্রীর কথায় বাদশার মন প্রসন্ন হল না। তিনি শ্রীসনাতনকে জিজ্ঞাসা করলেন। সনাতন বললেন—তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করছ কেন? তোমার মনকে জিজ্ঞাসা কর। “ যে তোমারে রাজ্য দিল সে তোমার গোসাঞা। তোমার দেশে তোমার ভাগ্যে জন্মিল আসিঞা।।” (চৈঃ চঃ মধ্যঃ ১।১৭৬) তুমি সাক্ষাৎ দর্শন কর। মানুষের কি এরূপ শক্তি ও আকর্ষণ থাকতে পারে? এরূপ মহা আকর্ষণ করবার শক্তি ঈশ্বর ছাড়া কারও থাকে না। বাদশা শ্রীসনাতনের কথা শুনে বড়
সুখী হলেন ও তিনি স্বচ্ছন্দে ভ্রমণ করুন ব'লে সকলকে জানালেন। গঙ্গাতটে এক বৃক্ষমূলে মহাপ্রভু উপবেশন করেছেন। সঙ্গে মাত্র প্রিয় পার্ষদবৃন্দ। ক্রমেই সন্ধ্যাকাল অতীত হতে চলল। এ সময় সনাতন ও রূপ দু ভাই দুই গুচ্ছ তৃণ দত্তে ধরে মহাপ্রভুর সামনে দণ্ডবৎ হয়ে পড়লেন। অন্তৰ্য্যামী মহাপ্রভু তাঁদের দেখে চিনতে পারলেন। প্রভু করুণার্দ্র হৃদয়ে দু-ভাইকে ভূমি থেকে উঠিয়ে দৃঢ় আলিঙ্গন করলেন এবং বললেন পূর্ব্বে তোমরা যে বার বার দৈন্য-পত্র আমাকে লিখেছিলে তাতে তোমাদের স্বভাব জেনেছি। তোমরা দুই ভাই জন্মে জন্মে আমার দাস। তোমাদের জন্য আমি রামকেলিতে এসেছি। আজ থেকে তোমাদের নাম হবে — শ্রীসনাতন ও শ্রীরূপ। বাদশা পূর্ব্বে তাঁদের নাম দিয়েছিলেন দবিরখাস ও সাকর মল্লিক। তারপর শ্রীসনাতন ও শ্রীরূপ সমস্ত গৌর-পার্ষদগণের চরণে কৃপা প্রার্থনা করলেন। শ্রীঅদ্বৈত আচার্য্য, শ্রীনিত্যানন্দ ও শ্রীবাস আদি ভক্তগণ দুই ভাইকে প্রচুর আশীর্ব্বাদ প্রদান করলেন। অনন্তর শ্রীসনাতন রূপের কনিষ্ঠ ভ্রাতা শ্রীঅনুপম পুত্র, পরিবারবর্গের সঙ্গে প্রভুর শ্রীচরণ দর্শন, বন্দনাদি করলেন। অনুপমের পুত্র শ্রীজীব তখন শিশু। প্রভু তাঁর শিরে কর পদ্ম ধারণ করে ও শ্রীচরণ-রজ দিয়ে যেন ভবিষ্যৎ আচার্য্য সম্রাটরূপে তাঁকে বরণ করলেন। ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু শ্রীগৌরহরি এইরূপে ভক্তবাসনা পূর্ণ করে পুরীর দিকে যাত্রা করলেন ও শ্রীসনাতন রূপকে আশীর্ব্বাদ করে গেলেন—“শীঘ্র সংসার বন্ধন থেকে কৃষ্ণ তোমাদের মুক্ত করে দিবেন।” শ্রীসনাতনের পিতৃদত্ত নাম ছিল অমর, শ্রীরূপের সন্তোষ এবং অনুপমের বল্লভ ছিল। মহাপ্রভু রামকেলি থেকে চলে যাবার পর শ্রীসনাতন ও শ্রীরূপ প্রভুর শ্রীচরণ-প্রাপ্তির জন্য দুইটী পুরশ্চরণ করলেন। পরিবারবর্গকে তাঁরা চন্দ্রদ্বীপে ও ফতেয়াবাদে প্রেরণ করলেন। শ্রীরূপ ও শ্রীঅনুপম কিছু ধন রামকেলিতে শ্রীসনাতনের জন্য রেখে আর সব নৌকায় ভরে ফতেয়াবাদে নিয়ে গিয়ে
সেই ধনের কিছুটা স্বজন এবং নিজ পরিবার বর্গের জন্য রাখলেন। মহাপ্রভুর সংবাদ গ্রহণের জন্য যাঁদের নিযুক্ত করা হয়েছিল তাঁরা এসে তাঁর বৃন্দাবন অভিমুখে যাত্রার কথা শ্রীরূপকে বললেন। তিনি শুনে পরম সুখী হলেন এবং অনুপমকে সঙ্গে নিয়ে মহাপ্রভুর সঙ্গে মিলনের জন্য চললেন। ক্রমে চলতে চলতে প্রয়াগে এলেন। সেইখানে শ্রীমহাপ্রভুর শ্রীচরণ দর্শন লাভ করলেন। প্রয়াগে প্রভুর দর্শনের জন্য লোকের এত ভিড় যে সারাদিন দর্শনের অবকাশ হল না। সন্ধ্যাকালে গঙ্গাতটে প্রভুকে দর্শন করে দুই ভাই দৈন্য-ভরে দন্ডবৎ হয়ে পড়লেন। প্রভু দেখেই চিনতে পারলেন। ভূমি থেকে উঠিয়ে তাঁদিগকে আলিঙ্গন করে সমস্ত কথা জিজ্ঞাসা করলেন। তাঁরা শ্রীসনাতনের ও অন্যান্য যাবতীয় সংবাদ বললেন। মৃদু হাস্য করে প্রভু বললেন —“শীঘ্র সনাতনের বন্ধন মুক্তি হবে।” ত্রিবেণীতে মহাপ্রভুর সন্নিকটে শ্রীরূপ ও অনুপম অবস্থান করতে লাগলেন ও তাঁর উপদেশ শুনতে লাগলেন ৷ তখন শ্রীবল্লভাচার্য্য ত্রিবেণীর পর পারে আড়াইলা গ্রামে বাস করতেন। একদিন তিনি প্রভুকে আমন্ত্রণ করে নিজগৃহে নিয়ে যান। প্রভুর সঙ্গে শ্রীরূপ ও অনুপম গেলে মহাপ্রভু শ্রীবল্লভাচার্য্যের কাছে শ্রীরূপের পরিচয় করিয়ে দিলে শ্রীবল্লভাচার্য্য তাঁদের আলিঙ্গন করতে উদ্যত হন। কিন্তু তাঁরা দৈন্য করে দূরে সরে যান। তা দেখে বল্লভাচার্য্য পরম সুখী হলেন। প্রভু ছলনা করে বললেন –আপনি এদের স্পর্শ করবেন না। তদুত্তরে বল্লভাচার্য্য বললেন-“এ দুই অধম নহে, সৰ্ব্বোত্তম। এঁদের বদনে সর্ব্বদা কৃষ্ণনাম নৃত্য করছে।” দুই ভাই আচার্য্যকে দন্ডবৎ করলে আচার্য্য আলিঙ্গন করলেন এবং বহু প্রশংসা করতে লাগলেন। তাঁদের স্নেহে মহাপ্রভু ত্রিবেণীতে অত্যধিক লোকের ভিড় দেখে দশাশ্বমেধ ঘাটে এলেন। তথায় দশদিন অবস্থান করে শ্রীরূপ গোস্বামীকে যাবতীয় ভাগবত তত্ত্ব-সার উপদেশ দেন—
প্রভু কহে শুন রূপ ভক্তিরসের লক্ষণ। সুত্ররূপে কহি বিস্তার না যায় বর্ণন ।। পারাপার শূন্য গভীর ভক্তিরস-সিন্ধু। তোমায় চাখাইতে তার কহি এক বিন্দু'।। (চৈঃ চঃ মধ্য ১৯/১৩৬ মহাপ্রভু বললেন- হে রূপ। তোমার কাছে ভক্তিরসের লক্ষণ সকল সূত্রাকারে বলছি তা শুন। কোটি জ্ঞানীর মধ্যে একজন মুক্ত শ্রেষ্ঠ, কোটি মুক্ত মধ্যে এক কৃষ্ণ-ভক্ত শ্রেষ্ঠ। শ্রীকৃষ্ণ ভক্ত নিষ্কাম ও শান্ত। কর্মী, জ্ঞানী, যোগী প্রভৃতি অশান্ত –ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ কামী। জীবের স্বরূপ অতি সূক্ষ্ম। জীব চিকণ ব্রহ্মের অনুশক্তি। জীব সুকৃতি-ফলে সাধু সঙ্গ পেলে স্বরূপ জ্ঞান লাভ করতে পারে। ভব বন্ধন তখন নাশ হয়। সদগুরু-কৃপায় জীব ভক্তি লতার বীজ “শ্রীকৃষ্ণ-মন্ত্র” প্রাপ্ত হয়। সে বীজ হৃদয়ক্ষেত্রে বপন করে নিত্য শ্রবণ কীৰ্ত্তন জল সেচন করতে থাকলে, ভক্তিলতা বৰ্দ্ধিত হয়ে পত্র পুষ্পাদিতে সুশোভিত হয়। ব্রহ্মলোক বৈকুণ্ঠ ভেদ করে গোলোকে পৌঁছে, ভজনকারী মালী তথায় সুখে প্রেম-ফল আস্বাদন করতে পারে। ভক্তির তিনটা অবস্থা— সাধন, ভাব ও প্রেম। প্রেমভক্তি যত গাঢ় হয় তত স্নেহ, মান, প্রণয়, রাগ, অনুরাগ, ভাব ও মহাভাব উৎপন্ন হয়। ভক্তিভেদে রতি পাঁচ প্রকার। শাস্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর রতি। শান্ত ভক্ত নবযোগেন্দ্র ও সনকাদি। দাস্য ভক্ত—ব্রহ্মা, শিব, নারদ, ব্রজে, রক্তক পত্রকাদি । সখ্য ভক্ত অৰ্জ্জুন, ভীম ও ব্রজে সুবল, শ্রীদামাদি। বাৎসল্য-ভক্ত বসুদেব, দেবকী, নন্দ ও যশোদা। মধুর ভক্ত—ব্রজে গোপীগণ। দ্বারকায় রুক্মিণী সত্যভামাদি। “এই ভক্তি-রসের করিলাম দিগ্‌দরশন। ইহার বিস্তার মনে করিহ ভাবন।। ভাবিতে ভাবিতে কৃষ্ণ স্ফুরয়ে অন্তরে। কৃষ্ণ কৃপায় অজ্ঞ পায় রস-সিন্ধু পারে।।”—(চৈঃ চঃ মধ্যঃ ১৯।২৩৪-২৩৫ ) মহাপ্রভু শ্রীরূপকে এই সমস্ত উপদেশ দেবার পর
তাকে বৃন্দাবনে যেতে আদেশ করলেন। তিনিও বারাণসীর দিকে যাত্রা করলেন। শ্রীরূপ ও অনুপম দুই ভাই প্রভুর বিচ্ছেদে ব্যথিত হৃদয়ে বৃন্দাবনের দিকে চলতে লাগলেন। শ্রীসনাতনের গৃহ ত্যাগ শ্রীরূপ ও অনুপম অর্থাদিসহ ফতেয়াবাসে চলে যাবার পর শ্রীসনাতন কেমনে রাজকার্য্য ত্যাগ করবেন চিন্তা করতে লাগলেন। বাদশা জীনাতন ও রূপের উপর রাজ্য চালাবার সমস্ত ভার অর্পণ করে রেখেছিলেন। তাঁদের নিয়ে তাঁর রাজত্ব। শ্রীসনাতন রাজ দরবারে যাওয়া বন্ধ করলেন ও শরীর অসুস্থ বলে রাজাকে জানালেন। তা শুনে হুসেন শাহ সনাতনের কাছে বৈদ্য পাঠালেন। বৈদ্য দেখলেন সনাতন পনের বিশ জন পণ্ডিতসহ গৃহে শাস্ত্র আলোচনা করছেন। রাজ-বৈদ্য শ্রীসনাতনের শরীর পরীক্ষা করলেন। কিন্তু কোন রোগ দেখতে না পেয়ে এ খবর বৈদ্য বাদশাকে দিলেন। বাদশা তাঁর মনের ভাব কিছু বুঝতে না পেরে স্বয়ং তাঁর গৃহে এলেন। সনাতন বাদশাকে দেখে পন্ডিতগণসহ গাত্রোত্থান করলেন ও বসবার জন্য তাঁকে উত্তম আসন দিলেন। বাদশা বললেন- তোমার কাছে বৈদ্য পাঠিয়েছিলাম। বৈদ্য বললে তোমার দেহে কোন রোগ নাই। আমার সমস্ত কাজ তোমাকে নিয়ে; অথচ তুমি সব ত্যাগ করে ঘরে বসে আছ। তোমার ভাইও চলে গেছে। আমার সব কাজ নষ্ট হতে চলেছে। তোমাদের অভিপ্রায় কি বুঝতে পারছিনা। শ্রীসনাতন বললেন-আমাদের দ্বারা আর কোন কাজ হবে না। আপনি অন্য লোক দিয়ে কাজ করান। তাঁর কথা শুনে যবনরাজ ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন-তোমরা আমার যাবতীয় কাজ নষ্ট করলে। শ্রীসনাতন বললেন-তুমি স্বতন্ত্র গৌড়েশ্বর, যা ইচ্ছা তা করতে পার। যে যেমন কাজ করে, বিচার করে তদনুরূপ শাস্তি তাকে প্রদান কর। এ কথা শুনে গৌড়েশ্বর ক্রোধভরে গাত্রোত্থান করলেনএবং সনাতনকে বন্দী করতে কাজীকে আদেশ দিলেন। ঐ সময় বাদশা উড়িষ্যা দেশ জয় করবার জন্য যাত্রা করছিলেন। তিনি সনাতনকে তাঁর সঙ্গে যেতে বললেন। শ্রীসনাতন বললেন তুমি দেবতা ও সাধুদের দুঃখ দিবার জন্য যাচ্ছে। আমি তোমার সঙ্গে যাব না। বাদশা উড়িষ্যার দিকে যাত্রা করলেন। এমন সময় শ্রীসনাতন শ্রীরূপের একখানি পত্র পেলেন। তিনি লিখেছেন—“তুমি যে কোন রকমে বন্দী অবস্থা থেকে ছুটে এসে। মুদি ঘরে আটশ' মোহর আছে। অনুপমকে (বল্লভকে) সঙ্গে নিয়ে আমি বৃন্দাবন অভিমুখে যাত্রা করলাম।” পত্র পেয়ে শ্রীসনাতন পরম সুখী হলেন। অনন্তর শ্রীসনাতন বন্দীশালের রক্ষককে অনুনয় করে বললেন—তুমি আমার কিছু উপকার কর। তুমি একজন জিন্দাপীর। তোমার কেতাব কোরাণ শাস্ত্রে বিশেষ জ্ঞান আছে। তুমি যদি ধর্ম বিচার করে একজন বন্দীকে মুক্ত করে দাও ঈশ্বর তোমার অনেক উপকার করবেন। পূর্বে আমি তোমার অনেক উপকার করেছি, এখন কিছু প্রত্যুপকার কর। তোমাকে পাঁচ হাজার মুদ্রা দিব। পুণ্য ও অর্থ দুইই লাভ হবে তোমার। কারাগার রক্ষক বললে- মহাশয়, আপনাকে ছাড়তে পারি; কিন্তু বাদশা যদি জানতে পারে, আমার অর্থ ও প্রাণ দুইটা নষ্ট হবে। শ্রীসনাতন বললেন-তুমি কোন ভয় কর না, আমি এ দেশে থাকব না। দরবেশ হয়ে মক্কা মদিনা চলে যাব। তুমি বাদশাকে বলবে শৌচ করতে গিয়ে লৌহ-বেড়িসহ জলে পড়ে কোথায় ডুবে গেছে; অনেক খোঁজ করেও পাওয়া গেল না। তোমাকে সাত হাজার মুদ্রা দিতে প্রস্তুত আছি। সাত হাজার মুদ্রা দেখে কারা রক্ষকের লোভ হল। লৌহ-বেড়ি কেটে রাত্রে গঙ্গা পার করে দিল। শ্রীসনাতন এবার মুক্ত হলেন। রাজপথ ত্যাগ করে বন পথে এক ভৃত্যসহ পাতড়া পৰ্ব্বতে এলেন। তথায় এক ডাকাতের সর্দার ভূঞা বাস করত। তার সঙ্গে এক হাত গণক ছিল। সে গণনা করে কার কাছে কত অর্থ আছে বলে দিতে পারত। পথিককে খুন করে ভূঞা তার অর্থ
কেড়ে আত্মসাৎ করত। শ্রীসনাতন ভূঞাকে বললেন- মহাশয়। কৃপা করে আমাদের এ পদ্ধতিটি পার করে দিন। ভূঞা বললে-- আপনাকে রাত্রের পার করে দিব। এখন রান্না করে ভোজনাদি করুন। রক্ষণের ব্যবস্থা করে দিল। শ্রীসনাতন দুই দিন পরে রন্ধন ভোজনাদি করলেন। রাজমন্ত্রী সনাতন চিন্তা করলেন এ ভূঞা আমাদের এত যত্ন করছে কেন ? ভৃত্য ঈশানকে জিজ্ঞাসা করলেন-তোমার কাছে অর্থ-কড়ি আছে না কি ? ঈশান বললে- সাতটি স্বর্ণ মোহর আছে। তখন শ্রীসনাতন বুঝলেন এ অর্থের লোভে ভুঞা তাঁদের এত যত্ন করছে। ঈশানকে একটু ক্রোধ ভরে বললেন-তুমি সঙ্গে এ কাল যম এনেছ কেন? তারপর সর্দার ভূঞাকে ডেকে মোহরগুলি তার হাতে দিলেন ও বললেন –দয়া করে আমাদের এখন পার করে দিন। সর্দার বললে-স্বামী! আমাকে রক্ষা করেছেন। রাত্রে আপনাদের খুন করে এ মোহর নিতাম । আমি সুখী হয়েছি, মোহর চাই না, পর্ব্বত পার করে দিব। শ্রীসনাতন বললেন—মহাশয় ! আপনি আমাদের রক্ষা করুন, মোহর নিয়ে পর্ব্বত পার করে দিন, নতুবা অন্য কেহ এ অর্থের লোভে আমাদের খুন করবে। অতঃপর সর্দার চারটা পাইক সঙ্গে দিয়ে রাত্রি থাকতে শ্রীসনাতনকে পৰ্ব্বত পার করে দিল । শ্রীসনাতন পর্ব্বত পার হয়ে ঈশানকে পুনঃ জিজ্ঞাসা করলেন—তোমার কাছে আর কিছু আছে নাকি ? ঈশান বললে—আর একটী মোহর আছে। শ্রীসনাতন বললেন-এটি নিয়ে তুমি ঘরে ফিরে যাও। শ্রীসনাতন ভৃত্যকে বিদায় দিয়ে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ হলেন। হাতে করোয়া, গায়ে ছেঁড়া কাঁথা ও মুখে হরিনাম। জীবনে কত ঐশ্বর্য্য ভোগ করেছেন; তাতে কখনও এত আনন্দ পান নি, আজ নিঃসঙ্গ ভাবে যে আনন্দ পাচ্ছেন। ক্রমে
চলতে চলতে সন্ধ্যাকালে হাজিপুরে এলেন। গঙ্গাতে স্নানাদি করে তটে এক উদ্যানের মধ্যে বসলেন। সূর্য্যদেব অস্তাচলে প্রবেশ করছেন, পশ্চিম গগন অরুণ রঙে অরুণ বর্ণ হয়ে উঠছে, পক্ষী সকল কলরব করতে করতে আলয়ে প্রবেশ করছে, গঙ্গার উভয় তটে বৃক্ষ শ্রেণী শোভা পাচ্ছে। বিশ্বনাথের রচিত এসব সুন্দর সৃষ্টি দেখে শ্রীসনাতনের হৃদয় যেন শ্রীহরির চরণ ভজন করবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। হাজিপুরে শ্রীসনাতনের ভগ্নীপতি শ্রীকান্ত থাকতেন। তিনি বাদশার জন্য অশ্ব খরিদ করে পাঠাতেন। শ্রীকান্ত সন্ধ্যাকালে গৃহের উপর থেকে দেখলেন দূরে উদ্যান মধ্যে একজন বৈরাগী বসে আছেন। ঔৎসুক্য হল তিনি। নিকটে গিয়ে তাঁকে দেখবেন। উদ্যানে এসে দেখলেন শ্রীসনাতন। একটু বিস্ময়ান্বিত হলেন; তারপর শ্রীসনাতনের মুখে সমস্ত কথা শুনলেন। শ্রীকান্ত যত্ন করে শ্রীসনাতনকে ঘরে নিলেন এবং দু-চার দিন থাকবার অনুরোধ জানালেন। শ্রীসনাতন বললেন-তুমি আমাকে এখনই গঙ্গা পার করে দাও, এক মুহূৰ্ত্তকালও আমি বিলম্ব করতে পারব না। যাবার সময় শ্রীকান্ত শ্রীসনাতনকে একখানা ভোট কম্বল দিলেন ৷ গঙ্গা পার হয়ে শ্রীসনাতন চলতে চলতে কয়েক দিনের মধ্যে কাশীতে এলেন। মহাপ্রভু কয়েকদিন পূর্ব্বে কাশীতে এসেছিলেন। তিনি শ্রীচন্দ্রশেখরের গৃহে অবস্থান করতেন এবং তপন মিশ্রের গৃহে ভোজন করতেন। শ্রীসনাতন লোক-পরম্পরায় শুনে শ্রীচন্দ্রশেখরের গৃহে উপস্থিত হলেন ও দ্বারদেশে বসলেন। অন্তর্যামী মহাপ্রভু সব জানতে পেরে চন্দ্রশেখরকে বললেন— দ্বারে একজন বৈষ্ণব এসেছেন। তাঁকে নিয়ে এস। চন্দ্রশেখর ছুটে এলেন দ্বারে। কিন্তু কোন বৈষ্ণব দেখলাম না৷ প্ৰভু বললেন - কোন লোক আছে কি না ? চন্দ্রশেখর বললেন—একজন দরবেশ আছে। প্রভু বললেন-তাকে নিয়ে এস। চন্দ্রশেখর দ্বারে এসে বললেন দরবেশ! তোমাকে প্রভু ডাকছেন। শ্রীসনাতনের আনন্দের সীমা রইল না।
নয়ন দিয়ে প্রেমাশ্রু পড়তে লাগল, গৃহে প্রবেশ করলেন, দেখলেন প্রভু ভক্ত সঙ্গে বসে আছেন। শ্রীসনাতন অঙ্গনে সাষ্টাঙ্গে দণ্ডবৎ হয়ে পড়লেন। প্রভু দ্রুত গাত্রোত্থান পূর্ব্বক তাঁকে তুলে দৃঢ় আলিঙ্গন করলেন। প্রেমাশ্রুপূর্ণ নয়নে শ্রীসনাতন বললেন—প্রভো! আমি পাপী, নীচ, অধম, আমাকে স্পর্শ কর না। প্রভু জোরপূর্ব্বক তার অঙ্গ মার্জ্জন করতে করতে বললেন-“প্রভু কহে -তোমা স্পশি আত্ম পৰিত্রিতে । ভক্তি বলে পার তুমি ব্রহ্মান্ড শোধিতে।।” -( চৈঃ চঃ মধ্যঃ ২০।৫৬) তারপর প্রভু তাঁকে নিজ পার্শ্বে বসালেন। তিনি সমস্ত বৃত্তান্ত প্রভুর শ্রীচরণে নিবেদন করলেন। তপন মিশ্র, চন্দ্রশেখর প্রভৃতি ভক্তগণের নিকট মহাপ্রভু শ্রীসনাতনের পরিচয় করিয়ে দিলেন। সকলে শ্রীসনাতনকে প্রেমে আলিঙ্গন করলেন ও বিস্ময়ান্বিত হয়ে বললেন-“কাকেরে গরুড় কর ঐছে শক্তি তোমার।।” কোথায় রাজমন্ত্রী, মহৈশ্বর্যশালী, আবার কোথায় সৰ্ব্বত্যাগী কৃষ্ণ ভক্ত ধীর; তুমি অচিন্ত্য শক্তিমান; তোমার কৃপা হলে কি না হতে পারে ? অতঃপর ভদ্রবেশ গ্রহণ করবার জন্য মহাপ্রভু শ্রীসনাতনকে আদেশ করলেন। শ্রীচন্দ্রশেখর তাঁকে গঙ্গাতটে নিয়ে গিয়ে নাপিত দ্বারা মুন্ডন করিয়ে শিখা ধারণ করালেন, পরে স্নান করালেন। চন্দ্রশেখর তাঁকে পরিধানের জন্য নূতন বস্ত্র দিলেন, তাঁর পুরাতন বস্ত্র মেগে নিয়ে তিনি কৌপীন বহির্ব্বাস করে পরিধান করলেন ও কন্ঠে তুলসী-মালা এবং দ্বাদশ-অঙ্গে তিলক ধারণ করে বৈষ্ণব-বেশ ধারণ করলেন। শ্রীসনাতনের দিব্য বৈষ্ণববেশ দেখে সকলের আনন্দের সীমা রইল না। তপন মিশ্রের ঘরে মহাপ্রভু ভোজন করলেন। ভুক্তাবশেষ শ্রীসনাতন গ্রহণ করলেন। মহাপ্রভু সনাতনকে পেয়ে যেন আনন্দ সিন্ধুর মধ্যে ভাসতে লাগলেন । শ্রীসনাতন গোস্বামীকে তাঁর ভগ্নীপতি শ্রীকান্ত যে ভোট কম্বল দিয়েছিলেন তা ত্যাগের উপায় চিন্তা করে তিনি গঙ্গাতটে এলেন। দেখলেন
এক গৌড়ীয়া কাথা ধুয়ে শুকাতে দিয়েছে। তাঁকে বললেন- ভাই। তুমি আমার এক উপকার করবে কি? গৌড়ীয়া বললেন— কি উপকার করতে পারি? শ্রীসনাতন বললেন -আমার কম্বলটি নিয়ে তোমার কাঁথাটি আমায় দাও। গৌড়ীয়া বললে-আপনি ভব্য-লোক হয়ে এত পরিহাস করছেন কেন? শ্রীসনাতন বললেন—পরিহাস নয়, সত্যই বলছি। এ বলে তাকে ভোট কম্বলটি দিয়ে কাঁথাটি নিলেন । অনন্তর সেটি গলায় বেঁধে প্রভুর শ্রীচরণে এসে দণ্ডবৎ করলে,প্রভু জিজ্ঞাসা করলেন— সনাতন, তোমার ভোট কম্বল কোথায় গেল? শ্রীসনাতন খুলে বললেন সব কথা। প্রভু বললেন—কৃষ্ণ বৈদ্য শিরোমণি, তোমার শেষ রোগ কেন রাখবেন? যিনি আমায় কু-বিষয় গর্ভ থেকে উদ্ধার করেছেন, তিনিই আমার শেষ বিষয় রোগ নষ্ট করলেন—উত্তর দিলেন শ্রীসনাতন। তিন মুদ্রার ভোট গায়, মাধুকরী গ্রাস। ধর্ম হানি হয় লোকে করে উপহাস ।। - (চৈঃ চঃ মধ্যঃ ২০।৯২) অনন্তর শ্রীসনাতন গোস্বামী শ্রীমহাপ্রভুর কাছে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন—হে প্রভো ! “কে আমি? কেনে আমায় জারে তাপত্রয় ? ইহা নাহি জানি কেমনে হিত হয়? সাধ্য সাধন-তত্ত্ব পুছিতে না জানি। কৃপা করি সব তত্ত্ব কহত আপনি।।” (চৈঃ চঃ মধ্যঃ ২০।১০২-১০৩) মহাপ্রভু বলতে লাগলেন—কৃষ্ণের কৃপা তোমাতে পূর্ণভাবে আছে। তোমার কোন তাপ নাই । তুমি কৃষ্ণ-ভক্তি ও কৃষ্ণ-তত্ত্ব সব জান। তথাপি দৃঢ়তার জন্য পুনঃ জিজ্ঞাসা করছ। এটি তোমার সাধু স্বভাব। তত্ত্ব বস্তু সাধুগণ জানলেও উত্তম ব্যক্তির নিকট দৃঢ়তার জন্য পুনঃ পুনঃ জিজ্ঞাসা করেন। “জীবের স্বরূপ হয় কৃষ্ণের নিত্য দাস। কৃষ্ণের তটস্থা শক্তি ভেদাভেদ প্রকাশ।।” ( চৈঃ চঃ মধ্যঃ ২০।১০৮) জীব স্বরূপতঃ শ্রীকৃষ্ণের দাস, অনুশক্তি। শ্রীকৃষ্ণসেবা তাঁর স্বরূপের
ধর্ম। ঈশ্বরের সঙ্গে জীবের ভেদ ও অভেদতা অচিন্ত স্বরূপ। কৃষ্ণ মায়াধীশ, জীব মায়াংশ। কৃষ্ণ সূৰ্য্যসদৃশ, জীব কিরণ কল-সদৃশ। শ্রীকৃষ্ণের অনন্ত শক্তির মধ্যে--চিৎ শক্তি, জীব শক্তি, মায়া শক্তি এ তিন শক্তি প্রধান। কৃষ্ণ মায়াবদ্ধ জীবের উদ্ধারের জন্য সাধু, শাস্ত্র ও গুরুরূপে অবতীর্ণ হন। বেদ শাস্ত্রের একমাত্র উদ্দেশ্য শ্রীকৃষ্ণ ভজন। বেদশাস্ত্রে ত্রিবিধ তত্ত্বের কথা বলেছেন সম্বন্ধ, অভিধেয় ও প্রয়োজন। কৃষ্ণ সম্বন্ধ তত্ত্ব, ভক্তি—অভিধেয় ও কৃষ্ণ প্রেম প্রয়োজন তত্ত্ব। সাধন ভক্তি দুই প্রকার—বৈধী সাধন-ভক্তি ও রাগানুগ সাধন-ভক্তি। বৈধী-সাধন-ভক্তি চৌষট্টি প্রকার। এর মধ্যে সাধু-সঙ্গ, নাম সংকীৰ্ত্তন, ভাগবত-শ্রবণ, মথুরাবাস ও শ্রদ্ধাসহ শ্রীমূর্তির সেবা, এই পাঁচটি অঙ্গ শ্রেষ্ঠ। দুই মাস ধরে মহাপ্রভু শ্রীসনাতন গোস্বামীর নিকট সমস্ত ভাগবত তত্ত্বসার উপদেশ করলেন এবং বললেন- এ সমস্ত সিদ্ধান্ত চিন্তা করে ভক্তি শাস্ত্র রচনা কর। তোমার দুই ভাই রূপ ও অনুপম বৃন্দাবনে চলে গেছে, তুমিও তথায় গমন কর। আমি নীলাচলে চলে যাচ্ছি। সময়মত তোমরাও নীলাচলে এসো। মহাপ্রভু একথা বলে ভক্তদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। প্রভুর বিরহে ভক্তগণ ক্রন্দন করতে লাগলেন। শ্রীসনাতনও কাশীবাসী ভক্তগণের থেকে বিদায় নিয়ে শ্রীবৃন্দাবনাভিমুখে চললেন। শ্রীরূপ ও শ্রীসনাতনাদির পূর্ব্বে সুবুদ্ধিরায় বৃন্দাবনে এসে বাস করছিলেন। নীলাচলে শ্রীরূপ কয়েক মাস বৃন্দাবন-বাসের পর শ্রীরূপ ও শ্রীঅনুপম মহাপ্রভুর দর্শনের জন্য নীলাচলাভিমুখে যাত্রা করলেন। গৌড়দেশে গঙ্গাতটে পৌঁছলে অকস্মাৎ তথায় শ্রীঅনুপম স্বধাম বিজয় করেন। শ্রীরূপ তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াদি করে বিষয় কার্য্য ব্যাপারে গৌড় দেশে নিজ গৃহে এলেন। কয়েকদিন পরে তিনি পুনঃ নীলাচলের দিকে চলতে লাগলেন। ক্রমে উড়িষ্যায় সত্যভামাপুরে পৌঁছে একরাত্র তথায় এক ব্রাহ্মাণ-গৃহে বিশ্রাম করলেন। শ্রীকৃষ্ণ-লীলা বিষয়ে এক নাটক শ্রীরূপ গোস্বামী বৃন্দাবন থেকে লিখতে আরম্ভ করেছিলেন। নাটকের বিষয় ভাবনা করতে করতে তিনি চলছিলেন। সত্যভামাপুরে শ্রীসত্যভামা দেবী স্বপ্নে শ্রীরূপ গোস্বামীকে বললেন-“আমার নাটক পৃথক ভাবে রচনা কর।” শ্রীরূপ বুঝতে পারলেন- শ্রীসত্যভামা দেবীই দর্শন দিয়ে ব্রজপুর ও দ্বারকাপুর লীলা একত্রে বর্ণন করতে নিষেধ করছেন। তখন থেকে তিনি দুই নাটকের নান্দী-শ্লোকাদি ভিন্ন ভাবে রচনা করলেন। ক্রমে চলতে চলতে পৌঁছালেন শ্রীনীলাচলে। দূর থেকে শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের চূড়া দেখে ভক্তি-গদ্‌গদ্ চিত্তে দন্ডবৎ করলেন। তারপর লোক-পরম্পরায় খবর নিয়ে শ্রীহরিদাস ঠাকুরের কুটিরে এলেন। পূর্ব্বে তাঁর কথা মহাপ্রভু শ্রীহরিদাসকে বলেছিলেন। শ্রীরূপ শ্রীহরিদাস ঠাকুরকে বন্দনা করতেই, শ্রীহরিদাস ঠাকুর অতি স্নেহভরে শ্রীরূপকে আলিঙ্গন করলেন। কিছু কুশল বার্তা জিজ্ঞাসা করবার পর বললেন, মহাপ্রভু এখনই আসবেন। মহাপ্রভুর আগমন হলে দুইজন আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে দণ্ডবৎ করলেন। মহাপ্রভু শ্রীরূপ গোস্বামীকে ভূমি থেকে উঠিয়ে দৃঢ় আলিঙ্গন করলেন। পাশে বসিয়ে বিবিধ কথা জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। শ্রীসনাতনের কথা জিজ্ঞাসা করলে, শ্রীরূপ বললেন তাঁর সঙ্গে দেখা হয় নাই। প্রভু বললেন, কাশীতে আমার কাছে দশদিন থাকার পর সনাতন বৃন্দাবনে গেছে। অনুপমের গঙ্গাপ্রাপ্তির কথা শুনেপ্রভু বড় খেদ করে বললেন, ইষ্টদেবের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় নিষ্ঠা ছিল। অতঃপর শ্রীরূপকে শ্রীহরিদাস ঠাকুরের কাছে থাকতে আদেশ করে প্রভু নিজ স্থানে এলেন এবং শ্রীগোবিন্দকে শ্রীরূপের জন্য প্রসাদ পাঠাতে আদেশ করলেন। দ্বিতীয় দিন মহাপ্রভু প্রধান প্রধান ভক্তগণকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীহরিদাস ঠাকুরের কুটিরে এলেন এবং শ্রীনিত্যানন্দ, শ্রীঅদ্বৈত, শ্রীরামানন্দ ও শ্রীসার্ব্বভৌম প্রভৃতির নিকট শ্রীরূপের পরিচয় প্রদান করলেন। শ্রীরূপ অতি
শ্রীসনাতন গোস্বামী দৈন্যের সহিত সকলকেই দণ্ডবৎ করলেন, সকলে তাঁকে আশীর্ব্বাদ করলেন। মহাপ্রভু স্বয়ং ভক্তদের কাছে শ্রীরূপের জন্য কৃপা ভিক্ষা চাইলেন। অন্যান্য বারের মত এবারও মহাপ্রভু গুণ্ডিচা মার্জ্জনোৎসব এবং আইটোটাতে ভোজনোৎসব করলেন। রথযাত্রা মহোৎসবে মহাপ্রভু ভত্তলগণকে নিয়ে মহানৃত্য-গীত কীৰ্ত্তন মহোৎসব করলেন। শ্রীরূপ সমস্ত দর্শন করলেন। একদিন মহাপ্রভু একটী শ্লোক বললেন- “কৃষ্ণেরে বাহির নাহি করিহ ব্ৰজ হৈতে। ব্ৰজ ছাড়ি কৃষ্ণ কভু না যান কাহাতে।। ” (চৈঃ চঃ অন্ত্যঃ ১৬৬) এ শ্লোক অকস্মাৎ শ্রীরূপের কাছে বলে মহাপ্রভু চলে গেলেন। শ্রীরূপ শুনে খুব বিস্ময়ান্বিত হলেন; বললেন অন্তৰ্য্যামী মহাপ্রভু সব জানতে পেরেছেন। সত্যভামাদেবীও এ কথাই বলেছিলেন। ব্রজপুরলীলা ও দ্বারকাপুর-লীলা এখন থেকে পৃথক পৃথক লিখব। রথযাত্রাকালে মহাপ্রভু এক শ্লোক পাঠ করেন। শ্লোকের বাস্তব অর্থ একমাত্র শ্রীস্বরূপ-দামোদর প্রভু জানতেন, অন্য কেহই জানে না। শ্রীরূপ সেই শ্লোক শুনে অনুরূপ একটা শ্লোক রচনা করে চালে গুঁজে রেখে সমুদ্র-স্নানে গিয়েছেন এমন সময় মহাপ্রভু এলেন। উপরের দিকে দৃষ্টিপাত করতেই চালে গোঁজা তাল-পত্রে শ্লোকটী দেখতে পেলেন। শ্লোক বের করে প্রভু পাঠ করতে লাগলেন। যেন অমৃতের ধারা, যেমন হস্তাক্ষর, তেমনি রসের পরিপাটী। আপন মনের কথা। মহাপ্রভু ভাবে আবিষ্ট হয়ে আছেন ৷ এমন সময় শ্রীরূপ সমুদ্র স্নান করে ফিরে এসে মহাপ্রভুকে দন্ডবৎ করলেন। মহাপ্রভু তাঁকে এক চাপড় মেরে জড়িয়ে ধরে বললেন - “গূঢ় মোর হৃদয় তুমি জানিলা কেমনে?” প্রভু শ্লোকটী স্বরূপ দামোদরকে দেখালেন । শ্লোক পড়ে স্বরূপ-দামোদর মহাপ্রভুর দিকে তাকাতে লাগলেন । মহাপ্রভু বললেন—রূপ আমার অভিপ্রায় কিরূপে জানল ? স্বরূপ-দামোদর বললেন-আমি অনুমান করছি পূর্ব্বে এঁকে তুমি কৃপা করেছ। তোমার কৃপা
একদিন ভক্তগণ-সঙ্গে মহাপ্রভু শ্রীহরিদাস ঠাকুরের কুটিরে এলেন এবং শ্রীরূপের লিখিত নাটক শুনতে চাইলেন। শ্রীরূপ লজ্জায় পড়তে চান না। মহাপ্রভু বারবার পড়তে অনুরোধ করায় শ্রীরূপ শ্লোক পড়লে লাগলেন। নাটক শুনে রামানন্দ রায় বললেন- “কবিত্ব না হয় এই অমৃতের ধার। নাটক লক্ষণ সব সিদ্ধান্তের সার।। প্রেম পরিপাটি এই অদ্ভুত বর্ণন। শুনি চিত্ত কর্ণের হয় আনন্দ ঘূর্ণন।”—(চৈঃ চঃ অন্তঃ ১। ১৯৩-১৯৪) তারপর রামানন্দ রায় মহাপ্রভুকে বললেন আপনার শক্তি ছাড়া জীবের এমন বর্ণন করার শক্তি থাকতে পারে না। অনুমানে বুঝতে পারছি, আপনি শক্তি দিয়ে করাচ্ছেন। শ্রীরূপের অপূর্ব্ব কবিত্ব, রস বিচার ও দৈন্যযুক্ত ব্যবহার দেখে সকলে শত মুখে তাঁর প্রশংসা করতে লাগলেন। প্রভু কয়েকমাস নিজস্থানে শ্রীরূপকে রাখার পর পুনঃ বৃন্দাবনে যেতে আদেশ করলেন। শ্রীরূপ প্রভুর আদেশ শিরে ধারণ করে বৃন্দাবনে ফিরে এলেন। শ্ৰীনীলাচলে-শ্রীসনাতন মথুরা থেকে একাকী ঝারিখন্ডের বন পথে শ্রীসনাতন গোস্বামী নীলাচল অভিমুখে যাত্রা করলেন। বন পথ দুর্গম, তথাকার জল দূষিত। শ্রীসনাতন চলতে লাগলেন, উপবাসে দিন কাটছে। মাঝে মাঝে জল পান করছেন মাত্র। জলবায়ুর দোষে তাঁর শরীরে কন্ডু-রসা হল। তিনি ভাবলেন, এ দেহ নিয়ে মহাপ্রভুর ও শ্রীজগন্নাথের দর্শন হবে না। শুনেছি মহাপ্রভু জগদীশের মন্দিরের সন্নিকটে থাকেন, মন্দির-সন্নিধানে আমার যাবার সাধ্য নাই। প্রচলিত মার্গে জগন্নাথের সেবকগণ যাতায়াত করেন, তাঁদের স্পর্শ করলে মহা অপরাধ হবে। শ্রীসনাতন ঠিক করলেন, শ্রীজগন্নাথের রথ চক্রের তলে পড়ে প্রাণ ত্যাগ করবেন। এ পাপ-দেহ আর রাখবেন না। ক্রমে লোক-পরম্পরায় খবর নিয়ে শ্রীহরিদাস ঠাকুরের কুটিরে উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে বন্দনা করলেন । দেখেই শ্রীহরিদাস ঠাকুর বুঝতে পারলেন, শ্রীরূপের বড় ভাই। শ্রীহরিদাস
আনন্দে শ্রীসনাতনকে দৃঢ় আলিঙ্গন করে বললেন- আপনি কি শ্রীরূপের বড় ভাই শ্রীসনাতন ? শ্রীসনাতন বললেন- হাঁ আমি সেই অধম। শ্রীহরিদাস—মহাপ্রভুর শ্রীমুখে আপনার মহিমা শুনেছি। শ্রীসনাতন—এ পাপীর আবার মহিমা কি? শ্রীহরিদাস—আপনি বৈষ্ণব-শিরোমণি। মহাপ্রভু বলেছেন আপনার ন্যায় বিজ্ঞ ব্যক্তি পৃথিবীতে নাই । শ্রীসনাতন— (কর্ণে অঙ্গুলি দিয়ে) শ্রীবিষ্ণু। শ্রীবিষ্ণু ! দুজনার আলাপ হচ্ছিল। এমন সময় মহাপ্রভু তথায় শুভাগমন করলেন। শ্রীহরিদাস ঠাকুর ও শ্রীসনাতন প্রভুর শ্রীচরণ মূলে দন্ডবৎ হয়ে পড়লেন। মহাপ্রভু শ্রীহরিদাসকে আলিঙ্গন করতে হরিদাস বললেন – সনাতন দন্ডবৎ করছে। মহাপ্রভু বললেন—এ্যাঁ, সনাতন এসেছে? ভূমি থেকে উঠিয়ে প্রেমভরে গাঢ় আলিঙ্গন করলেন তাঁকে। শ্রীসনাতন বললেন—প্রভো! আমায় ছুঁয়ো না, আমি নীচ অধম। তাতে শরীরে কন্ডুরসা। মহাপ্রভু— সনাতন। এ শরীর তোমার? না, আমার ? মহাপ্রভু জোর করে পুনঃ আলিঙ্গন করলেন। শ্রীসনাতনের প্রতি মহাপ্রভুর সে-রকম স্নেহ দেখে ভক্তগণ বিস্ময়ান্বিত হলেন। প্রভু ভক্তগণের সঙ্গে শ্রীসনাতনের মিলন করিয়ে দিলেন। বৈষ্ণবগণের চরণ বন্দনা করতেই তাঁরা শ্রীসনাতনকে আলিঙ্গন করতে লাগলেন। অতঃপর মহাপ্রভু সনাতনের কুশল বিষয়ে প্রশ্ন করলেন ও মথুরায় অন্যান্য বৈষ্ণবগণের কথা জিজ্ঞাসা করলেন। প্রভু বললেন—রূপ দশ মাস নীলাচলে ছিল; দিন দশ আগে গৌড় দেশে গেছে। অনন্তর প্রভু অনুপমের গঙ্গাপ্রাপ্তি সংবাদ শ্রীসনাতনকে জানালেন। শুনে সনাতন
বলতে লাগলেন শিশুকাল থেকে অনুপম শ্রীরামের উপাসনা করত। দিন রাত রামায়ণ পাঠ করত। রূপ ও আমি একদিন তাকে পরীক্ষা করবার জন্য বললাম—অনুপম ! শ্রীকৃষ্ণ পরম সৌন্দর্য্য ও মাধুর্য্যের সার, তুমি তাঁর ভজন কর;তিন ভাই একসঙ্গে কৃষ্ণকথা রসে কাল যাপন করব। আমাদের কথায় তার মন কিছুটা ফিরল, বলল- আমি চিন্তা করে দেখি। সারা রাত শ্রীরামের ত্যাগের কথা চিন্তা করতে করতে কেঁদে কেঁদে কাটাল, প্রাতঃকালে এসে বলল রঘুনাথের পাদপদ্মে বেচিয়াছোঁ মাথা । কাড়িতে না পারো মাথা, পাঙ বড় ব্যথা।। - (চৈঃ চঃ অন্তঃ ৪ 180 ) শ্রীরামচন্দ্রের প্রতি তার এইরূপ প্রগাঢ় নিষ্ঠা দেখে দু-ভাই তাকে আলিঙ্গন করে বললাম—তুমি সাধু, তুমি শ্রীরামচন্দ্রের ভজন কর, তোমাকে পরীক্ষা করবার জন্য আমরা এরূপ বলেছিলাম। মহাপ্রভু বললেন—“ সেই ভক্ত ধন্য যে না ছাড়ে প্রভুর চরণ। সেই প্রভু ধন্য যে না ছাড়ে নিজজন।।” (চৈঃচঃ অন্ত্যঃ ৪।৪৬) তারপর শ্রীসনাতন গোস্বামীকে শ্রীহরিদাস ঠাকুরের কাছে থাকতে বলে প্রভু নিজ স্থানে এলেন ও গোবিন্দের দ্বারা দুজনার জন্য মহাপ্রসাদ প্রেরণ করলেন। একদিন মহাপ্রভু হরিদাস ঠাকুরের কুটিরে এসে সনাতনকে বলতে লাগলেন—সনাতন! দেহত্যাগাদি দ্বারা কৃষ্ণ পাওয়া যায় না ; এ সব তমোধর্ম । ভজনের দ্বারা কৃষ্ণ পাওয়া যায়। সনাতন বললেন—হে সৰ্ব্বজ্ঞ! আমি অতি দীন। আমাকে বাঁচিয়ে তোমার কি লাভ হবে? মহাপ্রভু-সনাতন! তোমার শরীর আমার বড় সম্পত্তি। তুমি পরের
সম্পত্তি নাশ করতে চাও কেন হরিদাস ঠাকুর বললেন- সনাতন। তুমি ধন্য। তোমার দেহ প্রভুর সেবায় সহায়- ত্বরাপ। মহাপ্রভু-সনাতন। কৃষ্ণ প্রেম, ভক্তি-তত্ত্ব, বৈষ্ণবাচার ও বৃন্দাবনের লুপ্ত-তীর্থ উদ্ধার প্রভৃতি তোমার ঐ দেহ দ্বারা করাব। সনাতন গোস্বামী—আপনার গভীর মন, কারও বুঝবার শক্তি নাই। আমাকে যেমন নাচাবেন তেমনি নাচব। জ্যৈষ্ঠ মাসে একদিন শ্রীগদাধর পণ্ডিত মহাপ্রভুকে ও শ্রীসনাতনকে দ্বিপ্রহরে ভোজনের জন্য আমন্ত্রণ করলেন। প্রভু যথাকালে শ্রীগদাধর পন্ডিতের গৃহে এলেন। কিছুক্ষণ সনাতনের জন্য অপেক্ষা করে শেষে ভক্তগণের অনুরোধে প্রসাদ গ্রহণ করলেন। ভক্তগণ শ্রীসনাতনের জন্য বসে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে শ্রীসনাতন এলেন। তাঁর শরীর ঘর্মাক্ত, লাল হয়ে গেছে। মধ্যাহ্নের তপ্ত বালুকায় পা পুড়ে ফোস্কা পড়েছে। ভক্তগণ তাড়াতাড়ি উঠে অভ্যর্থনা করে তাঁকে ঘরের মধ্যে নিয়ে বসালেন। মহাপ্রভুর অবশেষ পাত্রটি গোবিন্দ শ্রীসনাতনকে দিলেন। ভক্তগণ একসঙ্গে বসে প্রসাদ পেলেন। প্রসাদ গ্রহনের পর শ্রীসনাতন মহাপ্রভুর কাছে এসে দন্ডবৎ করে বসলেন। প্রভু শুধালেন—সনাতন এত দেরী করলে কেন? শ্রীসনাতন বললেন সমুদ্র পথে এসেছি। তাই একটু দেরী হল। প্রভু জিজ্ঞাসা করলেন সিংহদ্বারের শীতল পথ ছেড়ে তপ্ত বালুকা-পথে এলে কেন? শ্রীসনাতন বললেন তপ্ত-বালুকা পথে চলতে আমার কোন কষ্ট হয়নি। সিংহদ্বারের পথ দিয়ে আসবার অধিকার আমার নাই। কারণ ঐ পথে শ্রীজগন্নাথের সেবকগণ নিয়ত যাতায়াত করেন। তাঁদের ছোঁয়া গেলে আমার মহা-অপরাধ হবে। প্রভু বললেন—তুমি পরম পবিত্র স্বরূপ। তোমার স্পর্শে দেব মুনিগণও পবিত্র হয়।
“তথাপি ভক্ত-স্বভাব-মর্য্যাদা রক্ষণ। মর্যাদা পালন হয় সাধুর ভূষণ।। মৰ্য্যাদা লঙ্ঘনে লোক করে উপহাস। ইহলোক পরলোক দুই হয় নাশ ।।” -(চৈঃ চঃ অন্ত্যঃ ৪।১৩০-১৩১ ) সনাতন। তুমি বিজ্ঞ-শিরোমণি। তুমি যদি শাস্ত্র মর্যাদা জগতকে শিক্ষা না দাও, জগত কেমনে শিখবে? মহাপ্রভু একথা বলে শ্রীসনাতনকে ধরে আলিঙ্গন করলেন। শ্রীসনাতনের বৈরাগ্য-সদাচারে ও শিষ্টাচারে সমস্ত গৌরভক্তগণ চমৎকৃত হয়ে ধন্য ধন্য বলে তাঁকে প্রশংসা করতে লাগলেন। একদিন শ্রীজগদানন্দ পন্ডিত এলেন শ্রীসনাতনকে দর্শন করতে। শ্রীসনাতন পন্ডিতকে দন্ডবৎ করে এক দুঃখের কথা নিবেদন করলেন এবং একটি সৎ পরামর্শ চাইলেন। শ্রীজগদানন্দ পন্ডিত বললেন-রথযাত্রা দর্শন করে আপনি বৃন্দাবনে চলে যান, সেটি আপনার প্রভু-দত্ত আদেশ। সনাতন গোস্বামী পন্ডিতের কথায় পরম সুখী হলেন। কিছুক্ষণ ইষ্ট-গোষ্ঠী করে শ্রীজগদানন্দ পন্ডিত নিজ স্থানে চলে গেলেন। এমন সময় মহাপ্রভু তথায় এলেন। শ্রীসনাতন গোস্বামী দন্ডবৎ করতেই তাঁকে ধরে প্রভু দৃঢ় আলিঙ্গন করলেন। তাতে শ্রীসনাতন মনঃক্ষুন্ন হয়ে বললেন—শ্রীজগদানন্দ পন্ডিত বলছেন রথাযাত্রা দেখে বৃন্দাবনে যেতে। তাই ভাল, অপরাধের থেকে রক্ষা পাই। একথা শুনে শ্রীজগদানন্দের প্রতি ক্রোধের ভাব দেখিয়ে মহাপ্রভু বলতে লাগলেন—জগা কালকের পড়ুয়া, সে তোমাকে উপদেশ দেয়। ব্যবহারে পরমার্থে তুমি তার গুরুতুল্য। সে নিজের অধিকার বুঝে না। তুমি পরম প্রামাণিক বিজ্ঞজন। আমারও উপদেষ্টা। প্রভুর এ কথা শুনে সনাতন গোস্বামী প্রভুর চরণ তুলে লুটিয়ে পড়ে খেদ পূৰ্ব্বক বলতে লাগলেন-আজ বুঝতে পারলাম আপনি শ্রীজগদানন্দকে কত আপন জ্ঞান করেন, সে কত
সৌভাগ্যবান। শ্রীজগদানন্দকে আত্মীয়তারূপ সুধারস পান করাচ্ছেন, আর, গৌরব স্তুতির দ্বারা আমাকে পান করাচ্ছেন নিম্ন- নিসিন্দা বস। আজও আপনি আমাকে আপন বলে কৃপা করলেন না। আমার দুর্ভাগ্য। শ্রীসনাতনের কথা শুনে প্রভু যেন খুব লজ্জিত হলেন ও শ্রীসনাতনকে সুখী করবার জন্য বলতে লাগলেন—সনাতন। তোমা অপেক্ষা জগদানন্দ আমার প্রিয় নহে। মৰ্য্যাদা লঙ্ঘন আমি সইতে পারি না। তোমার কথা শুনে তোমায় স্তুতি করতে বাধ্য হচ্ছি। সনাতন! তোমার দেহকে তুমি ঘৃণ্য জ্ঞান কর, কিন্তু আমি অমৃতের সমান জ্ঞান করি। আমি তোমাদিগকে লালা এবং নিজেকে লালক জ্ঞান করি। লাল্যের লালনাদিতে লালকের ঘৃণা বোধ হয় না, সুখ বোধ হয়। তদ্রূপ তোমাদের সংস্পর্শে এলে আমার পরম আনন্দ হয়। ভক্তের দেহ অপ্রাকৃত নিত্য শুদ্ধ। পরীক্ষা করবার জন্যই কৃষ্ণ তোমার দেহে কভু রসা সৃষ্টি করেছেন। ঘৃণা করে যদি তোমায় আলিঙ্গন না করতাম কৃষ্ণ স্থানে আমার অপরাধ হত। এই বলে মহাপ্রভু পুনঃ শ্রীসনাতনকে আলিঙ্গন করলেন, তৎক্ষণাৎ কভু রসা দূর হয়ে অঙ্গ সুবর্ণের ন্যায় হল। অতঃপর শ্রীসনাতন গোস্বামী দোলযাত্রা দর্শন করে মহাপ্রভুর নির্দেশমত বৃন্দাবন অভিমুখে যাত্রা করলেন। যে পথ দিয়ে মহাপ্রভু বৃন্দাবন গিয়েছিলেন শ্রীসনাতনও সে পথ ধরে বৃন্দাবনে চললেন। তিনি বৃন্দাবনে এলে শ্রীরূপ গোস্বামীও গৌড় দেশস্থ কুটুম্ব-বর্গের যথাযথ ব্যবস্থা করে পুনঃ বৃন্দাবনে ফিরে এলেন। শ্রী শ্রীগোবিন্দদেবের প্রকট একদিন শ্রীরূপ গোস্বামী যমুনার তীরে বসে ভজন করছেন এবং মহাপ্রভুর কথা চিন্তা করছেন— “প্রভুর আদেশ কিছুই পালন করতে পারলাম না।” এমন সময় এক ব্রজবাসী তথায় এলেন, দেখতে বড় সুন্দর। তিনি বললেন স্বামিন্ ! আপনাকে বড় দুঃখী মনে হচ্ছে। কারণ কি? “আমি মহাপ্রভুর আদেশ পালন করতে পারলাম না। আমার জীবন বৃথা।”
ব্রজবাসী— মহাপ্রভুর কি আদেশ ? শ্রীরূপ— শ্রীমূর্ত্তির সেবাপ্রকাশ, লুপ্ত তীর্থ উদ্ধার প্রভৃতি। ব্রজবাসী — স্বামিন। আমার সঙ্গে আসুন। শ্রীরূপ গোস্বামী ব্রজবাসীর সঙ্গে চললেন। ব্রজবাসী একটী টিলা দেখিয়ে বললেন-এ টিলার নাম গোমা-টিলা। এর মধ্যে শ্রীগোবিন্দদের আছেন, প্রতিদিন পূৰ্ব্বাহ্নে একটি গাভী এসে টিলাটিকে দুগ্ধ ধারায় স্নান করিয়ে যায়। ব্রজবাসী এ বলে অন্তর্ধান হলেন। শ্রীরূপ গোস্বামী বিস্ময়ান্বিত হয়ে চিন্তা করতে লাগলেন—ইনি কে? কি কথাই বা বলে গেলেন ? এ কি স্বপ্ন না বাস্তব? পর দিন পূর্ব্বাহ্নে তিনি তথায় গেলেন, দেখলেন একটী গাভী এসে টিলাটির উপর দাঁড়িয়ে দুধের ধারা বর্ষণ করে চলে গেল। তখন শ্রীরূপ গোস্বামীর পূর্ণ বিশ্বাস হল, তিনি আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। গ্রামে এসে তিনি বিশিষ্ট গোপগণের কাছে এ কথা বললেন। শুনে সকলে আনন্দে নৃত্য করতে লাগলেন । অনন্তর তাঁরা কোদাল কুড়ালি নিয়ে গোমাটিলায় এলেন ও শ্রীরূপ গোস্বামীর নির্দেশমত খনন আরম্ভ করলেন। কিছুটা খনন করতেই শ্রীমূৰ্ত্তি প্রাপ্ত হলেন। শ্রীগোবিন্দদেবের মূর্তিখানি যেন কোটি কন্দর্পের দর্পহারী রূপ;নয়ন-মনের আনন্দ বর্দ্ধন করছিল। আনন্দভরে গোপগণ 'হরি' 'হরি' ধ্বনি করতে লাগলেন। শ্রীরূপ গোস্বামী সজল-নয়নে সাষ্টাঙ্গে দন্ডবৎ করতে লাগলেন। “শ্রীগোবিন্দদেবের প্রকট ধ্বনি হৈতে। উল্লাসে অসংখ্য লোক ধায় চারিভিতে।।”—(ভঃ রঃ ২।৪৩৩) ব্রজবাসী গোপগণ আনন্দ-ভরে ভারে ভারে দুই-দুধ-চাল-তরকারি প্রভৃতি আনতে লাগলেন। সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণগণ নৈবেদ্য তৈরী করতে লাগলেন। ব্রাহ্মণগণ শ্রীগোবিন্দদেবের মহাভিষেক করে নৈবেদ্য ভোগ লাগালেন। শ্রীরূপ গোস্বামীর আনন্দের সীমা রইল না। গোস্বামিগণ উপস্থিত হ’লেন, শ্রীগোবিন্দদেব দর্শন করে সুখ সিন্ধুতে ভাসতে লাগলেন। এ সংবাদ শ্রীরূপ গোস্বামী শীঘ্র নীলাচলে শ্রীমহাপ্রভুর নিকট প্রেরণ
করলে মহাপ্রভু ভক্তগণের সঙ্গে আনন্দ-সাগরে যেন নিমজ্জমান হলেন। তৎক্ষণাৎ শ্রীকাশীশ্বর পণ্ডিতকে বৃন্দাবনে শ্রীরূপ গোস্বামীর নিকট প্রেরণ করলেন। শ্ৰীশ্ৰীমদনগোপালদেব প্রকট মহাবনে শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থানের সন্নিকটে এক পত্র-কুটিরে শ্রীসনাতন গোস্বামী ভজন করতেন। মাধুকরীর জন্য তিনি একদিন যমুনার তট দিয়ে গ্রামে যাচ্ছেন। মদন গোপালদেব তখন যমুনার তীরে গোপ-বালকদের সঙ্গে খেলা করছিলেন। শ্রীসনাতন গোস্বামীকে দেখেই বাবা। বাবা বলে ছুটে এলেন এবং তাঁর হাত ধরলেন, বললেন বাবা! আমি তোমার কাছে যাব। শ্রীসনাতন—লালা! আমার কাছে কেন যাবে ? গোপাল— তোমার কাছে আমি থাকব । শ্রীসনাতন—আমার কাছে থাকবে, খাবে কি? গোপাল—বাবা! তুমি কি খাও ? শ্রীসনাতন—আমি শুষ্ক রুটি চানা খাই। গোপাল— আমিও তা খাব। শ্রীসনাতন—তুমি তা খেয়ে থাকতে পারবে না, তুমি মা-বাপের কাছেই থাক। পুনঃ গোপাল বললেন, বাবা! আমি তোমার কাছে থাকব। সনাতন গোস্বামী বালকটিকে বুঝিয়ে সুজিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে মাধুকরীতে গেলেন ৷ তিনি রাত্রে স্বপ্ন দেখলেন সে শিশুটি হাসতে হাসতে কাছে এসে তাঁর হাত ধরে বলছেন—বাবা! আমার নাম মদন গোপাল, আমি কাল তোমার কাছে আসব। এ বলে মদন গোপালদেব অন্তর্ধান হলেন। শ্রীসনাতনের স্বপ্ন ভাঙল। আনন্দে আত্মহারা হলেন, কি দেখলাম? এমন সুন্দর শিশু কখনও দেখিনি। হরি স্মরণ করতে করতে কুটিরের কপাট খুললেন, দেখলেন দরজার
সামনে এক অপূৰ্ব্ব গোপাল মূৰ্ত্তি, তাঁর অঙ্গ শোভায় চারিদিক আলোকিত। শ্রীসনাতন গোস্বামী স্তম্ভিতভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর প্রেমাক্র ফেলতে ফেলতে ভূতলে দণ্ডবৎ করলেন। অতঃপর শ্রীমুর্তির পুজা অভিষেকাদি করলেন। শ্রীরূপ গোস্বামী সেই অপূৰ্ব্ব মূৰ্ত্তি দেখে প্রেমাবিষ্ট হলেন। শ্রীসনাতন গোস্বামী স্বীয় পত্র-কুটিরে মদনগোপাল দেবের সেবা করতে লাগলেন। এ শুভ সংবাদ মহাপ্রভুকে দেওয়ার জন্য শ্রীরূপ গোস্বামী তৎক্ষণাৎ একজন লোককে পুরী ধামে প্রেরণ করলেন। শ্রীসনাতন গোস্বামী আটা ভিক্ষা করে এনে, রুটি করে গোপালের ভোগ দেন। তার সঙ্গে একটু শাক তরকারী দেন। কোন দিন তৈল ও লবণের অভাবে তরকারী তৈরী করা হয় না, শুষ্ক রুটি মাত্র ভোগ দেন। এতে শ্রীসনাতনের বড় দুঃখ হতে লাগল । কিন্তু উপায় নাই;কারণ মহাপ্রভু তাঁকে যে সেবা দিয়েছেন—ভক্তিগ্রন্থ প্রণয়নাদি, তা নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকেন কখন তিনি পয়সা ভিক্ষা করে তৈল লবণ আনবেন ? শ্রীসনাতন গোস্বামীর মনে কষ্ট হতে লাগল—“মহারাজ কুমার মদন মোহন। তিঁহ শুষ্ক রুটি ভুঞ্জে দুঃখী সনাতন।।” (ভঃ রঃ ২।৪৬২) অন্তর্যামী ভগবান্ সনাতনের মন জানলেন। আমি শুষ্ক রুটি খাই, সনাতনের মনে তাতে দুঃখ হচ্ছে, সনাতন রাজ সেবা করতে চায়। “সনাতন মন জানি মদন গোপাল। নিজ সেবা বৃদ্ধি ইচ্ছা হইল তৎকাল।।” (ভঃ রঃ ২।৪৬৩) শ্রীমদন গোপাল দেবের নিজ সেবা বৃদ্ধি করার ইচ্ছা করলেন। মুলতানের একজন ধনাঢ্য ক্ষত্রিয়—নাম শ্রীকৃষ্ণ দাস কপূর। তিনি বাণিজ্য করবার জন্য মথুরায় এসেছিলেন। যমুনার চড়ায় তাঁর নৌকা লেগে গিয়েছিল, কোন উপায়ে নৌকা জলে নামাতে পারলেন না। কি হবে? কৃষ্ণ দাস কপূর লোক-মুখে শুনতে পেলেন বৃন্দাবনে এক বড় সাধু বাস করেন, তাঁর নাম—শ্রীসনাতন গোস্বামী। কৃষ্ণ-দাস কপূর শ্রীসনাতনের কাছে এসে
দেখলেন, বাবা বসে লিখছেন, পরিধানে কৌপীন মাত্র, বৈরাগ্যে শুষ্ক তনু। কৃষ্ণদাস কপূর দন্ডবৎ করলেন। শ্রীসনাতন গোস্বামী তাঁকে বসবার জন্য একটি পত্রের আসন দিলে, আসনটা হস্ত দ্বারা স্পর্শ করে কৃষ্ণদাস নীচে বসে বললেন, বাবা ! কৃপা করুন। শ্রীসনাতন গোস্বামী বললেন—আমি ভিখারী, কি কৃপা করব? কৃষ্ণদাস কপূর—কেবলমাত্র আপনার আশীর্ব্বাদ প্রার্থনা করি। যমুনার চড়ায় আমার নৌকা লেগে গেছে, কোন উপায়ে সরে না। শ্রীসনাতন—আমি ত কিছুই জানি না, ঐ মদন গোপালকে সব কথা বলুন । কৃষ্ণদাস – (দন্ডবৎ করে) হে মদন গোপাল দেব। তোমার কৃপায় যদি চড়া থেকে নৌকা সরে, এবার যত লাভ হবে সব তোমার সেবার জন্য দিয়ে দেব। এরূপ প্রার্থনা করে কপূর শেঠ বিদায় হল। সে দিন বিকেল বেলা, এমন ঝড় বৃষ্টি হল যে কপূর শেঠের নৌকা অনায়াসে যমুনার মধ্যে চলে গেল। কৃষ্ণদাস কপূর সব বুঝতে পারলেন। সে-বার ব্যবসা করে কৃষ্ণদাস বহু টাকা লাভ করেন এবং সেই সমস্ত অর্থ দিয়ে শ্রীমদন গোপাল দেবের মন্দির, ভোগশালাদি ও নিত্য রাজ-সেবার ব্যবস্থা করে দিলেন। মদন গোপালের রাজ-সেবা দেখে শ্রীসনাতন গোস্বামী বড়ই সুখী হলেন। কৃষ্ণদাস কপুর শ্রীসনাতন গোস্বামীর থেকে দীক্ষা গ্রহণ করলেন। শ্রীবৃন্দাদেবীর আত্মপ্রকাশ শ্রীগোবিন্দ, শ্রীমদন গোপাল ও যোগ-পীঠের পুনঃ আবির্ভাবের পর শ্রীরূপ গোস্বামী বৃন্দাদেবীর কথা চিন্তা করতে লাগলেন। এক রাত্রিতে বৃন্দাদেবী এসে শ্রীরূপকে বলছেন আমি ব্রহ্মকুন্ডের তীরে আছি, তুমি তথায় আমার দর্শন পাবে। শ্রীরূপ প্রাতঃকালে যমুনায় স্নান করে ভজন পূজনাদিসমাপ্ত করলেন। অনন্তর স্বপ্নের কথা চিন্তা করতে করতে ব্রহ্মকুণ্ডের তীরে এসে চারিদিকে দেখতে লাগলেন। হঠাৎ দেখলেন তাঁর দেশে সুবর্ণ কান্তি নিশিত এক দিবা নারী। তার অষ্টায় দশদিক আলোকিত এবং মাধুর্য্যে দশমিক্‌ স্নিগ্ধ। শ্রীরূপ গোস্বামী বুঝতে পেরে সাধারণ বন্দনা করে স্তুতি করতে লাগলেন –হে লৌহিদ-সেবা সহায়িনী। গোবিন্দ বাঞ্ছা-গৃত্তিকারিণী। তোমাকে বারবার বন্দনা করি। এ ভাবে শ্রীবৃন্দাদেবীও পুনঃ প্রকট হলেন। শ্রীরাধারাণীর দর্শন দান শ্রীরূপ ও শ্রীরঘুনাথ দাসকে দেখবার জন্য শ্রীসনাতন গোস্বামী একদিন রাখা কুন্ডে এলে দুই জন উঠে তাঁকে বন্দনা করলেন এবং বসবার জন্য আসন দিলেন। পরে তিন জনে ইউগোষ্ঠী করতে লাগলেন। শ্রীরূপ গোস্বামী চাটু পুষ্পাঞ্জলি নামক একটি শ্রীরাধা স্তব লিখেছিলেন। শ্রীসনাতন গোস্বামী জবটি পড়লেন। তাতে একটা শ্লোক আছে— নবগোরোচনাগৌরী প্রবরেন্দী বরাম্বরাম্। মণিস্তবক-বিদ্যোতিবেণী-ব্যালাঙ্গনা-ফণাম্।। (শ্রীচাটুপুষ্পাঞ্জলি) “ব্যালাঙ্গনাফশাম্‌” শ্রীরাধা-ঠাকুরাণীর ‘বেশী সপিণীর ফণার ন্যায় শোভা পাচ্ছে। শ্রীসনাতন গোস্বামী এই উপমা বিষয়ে চিন্তা করতে লাগলেন— “বিষধর ফণিনীর ফণার সঙ্গে তুলনা যুক্তিযুক্ত কিনা ? মধ্যাহ্নকালে স্নানের জন্য শ্রীসনাতন রাধা-কুন্ডে এসে কুন্ডের স্তুতি করে স্নান করতে লাগলেন। এমন সময় কুন্ডের তীরে কিছু দূরে বৃক্ষের তল দেশে গোপ-কুমারীগণকে খেলা করতে দেখলেন। তাঁদের প্রতি দৃষ্টিপাত করতেই তাঁদের পৃষ্ঠ-দেশে দোদুল্যমান লম্বিত বেণীগুলিতে শ্রীসনাতন গোস্বামীর সর্প ভ্রম হল। তিনি তখন ব্যগ্র হয়ে কুমারিগণকে আহ্বান করে বললেন— হে কুমারিগণ! সাবধান হও, তোমাদের পৃষ্ঠ দেশে সপ উঠছে। কুমারিগণ নিজ মনে সানন্দে খেলছিল, তাঁর কথা শুনছিল না। তখন তিনি স্বয়ং বাধা দেওয়ার জন্য ছুটলেন; তাঁকে আসতে দেখে গোপ-কুমারিগণসহ শ্রীরাধা-ঠাকুরাণী হাসতে হাসতে অন্তর্ধান হ'লেন। অবাক হয়ে শ্রীসনাতন গোস্বামী দাঁড়িয়ে রইলেন। অতঃপর শ্রীরূপের উপমার কথা বুঝতে পারলেন। “শ্রীদানকেলিকৌমুদী” শ্রীরূপ গোস্বামী “ললিত মাধব” নামে একখানি নাটক রচনা করেছিলেন;নাটকটিতে বর্ণিত আছে দ্বারকা-লীলা। শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামীকে নাটকখানি পাঠ করতে দিলেন। গ্রন্থখানি পাঠ করে রঘুনাথ দাস গোস্বামী এত বিরহ-বিধুর হলেন যে প্রাণ ত্যাগ করতে উদ্যত হলেন। শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামীকে ভাবাক্রান্ত দেখে শ্রীরূপ গোস্বামী সব বুঝতে পারলেন। তখন তিনি ব্রজের নিত্য-লীলাযুক্ত “দানকেলি কৌমুদী” নামক একটি গ্রন্থ রচনা করে উহাও পাঠ করবার জন্য শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামীকে দিলেন। এবার এ গ্রন্থ পাঠ করে শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামী যেন সুখের সাগরে ডুবে গেলেন । দানকেলি পাঠে রঘুনাথ বিজ্ঞবর । সুখের সমুদ্রে মগ্ন হৈলা নিরন্তর।। - (ভক্তি রত্নাকর পঞ্চম তরঙ্গে ৭৭৪) “শ্রীকৃষ্ণের দুগ্ধ দান” অন্ন-জল ত্যাগ করে শ্রীসনাতন গোস্বামী পাবন-সরোবর তটে নির্জ্জন বনে ভজন করতে লাগলেন ৷ অন্তৰ্য্যামী ভগবান্ সব জানতে পারলেন— ভক্ত অনাহারে আছেন। ভক্তের আহার ভগবান্ নিজেই যোগান—এ কথা তাঁর বাণীতে আছে। গোপ বালকের বেশে শ্রীকৃষ্ণ দুগ্ধ নিয়ে সন্ধ্যার একটু আগে গোস্বামীর নিকট এলেন ।কৃষ্ণ গোপ-বালকের হলে দুগ্ধ লৈয়া। দাঁড়াইলা গোস্বামী সম্মুখে হৰ্ষ হৈয়া।। (ভঃ রঃ ৫।১৩০৩) শ্রীকৃষ্ণ বললেন বাবা। তোমার জন্য দুধ এনেছি। শ্রীসনাতন—তুমি কেন কষ্ট করে দুধ আনলে? শ্রীকৃষ্ণ —তুমি না খেয়ে আছ তাই। শ্রীসনাতন—তুমি কেমনে জানলে যে আমি না খেয়ে আছি? শ্রীকৃষ্ণ — সরোবরের তীরে গোচারণ করতে এসে দেখেছি তুমি না। খেয়ে আছ। শ্রীসনাতন—অন্য কেহ এলেন না কেন? শ্রীকৃষ্ণ—ঘরে অনেক কাজ, তাই আমাকে আসতে হয়েছে। শ্রীসনাতন—আহা! তুমি অতটুকু শিশু, তোমার কত কষ্ট হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ—না, না, বাবা! আমার কোন কষ্ট হয় নাই। শ্রীসনাতন গোস্বামী তাড়াতাড়ি ভান্ডটি নিয়ে বললেন—লালা, বস পাত্রটি খালি করে দিই। শ্রীকৃষ্ণ—না বাবা। আমি বসতে পারব না, সন্ধ্যা হয়ে আসছে গো দোহন করতে হবে, ভান্ড কাল নিয়ে যাব। এ কথা বলতে বলতে বালক অদৃশ্য হল। শ্রীসনাতন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। সব কথা বুঝতে পারলেন, শ্রীকৃষ্ণই এ সব করেছেন। নেত্র-জলে ভাসতে ভাসতে উঠে দুধ পান করলেন তারপর থেকে তিনি মাধুকরী করে খেতেন। ব্রজবাসিগণ তাঁর থাকার জন্য একটি কুটির করে দিলেন।“শ্রীরাধিকার স্নেহ” ১৯১ একদিন শ্রীরূপ গোস্বামী শ্রীসনাতন গোস্বামীকে পায়স খাওয়াতে ইচ্ছা করলেন। কিন্তু পায়স তৈরী করার কোন সামগ্রী তখন কুটিরে ছিল না। ইচ্ছে ইচ্ছা পূর্ণকারিণী শ্রীরাধা-ঠাকুরাণী সব বুঝতে পারলেন। তখন একটি গোপকুমারী বেশে তিনি শ্রীরূপের জন্য দুধ, চাল ও চিনি নিয়ে এলেন এবং ডাকতে লাগলেন— স্বামিন। স্বামিন্ ! সিধা গ্রহণ করুন। কুমারীর কণ্ঠধ্বনি শুনে শ্রীরূপ গোস্বামী কুটিরের দ্বার খুললেন। দেখলেন এক অপরূপ কুমারী সিধা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শ্রীরূপ গোস্বামী বললেন—লালি। তুমি এ-সময়ে এলে কেন? শ্রীরাধা—স্বামিন্! আপনাদের সেবার জন্য সিধা এনেছি। শ্রীরূপ—লালি। তুমি এত কষ্ট করলে কেন? শ্রীরাধা—বাবা। কিসের কষ্ট ? সাধুর সেবার জন্য এনেছি। শ্রীরূপ—সিধা নিয়ে বসতে বললে, কুমারী বললেন আমি বসতে পারব না, ঘরে কাজ আছে। বলতে বলতে কুমারী অদৃশ্য হলেন। শ্রীরূপ * গোস্বামী ফিরে দেখলেন কুমারী নাই তিনি পরম বিস্ময়ান্বিত হলেন। অনন্তর পায়স তৈরী করে শ্রীগোবিন্দদেবকে ভোগ দিলেন। প্রসাদ শ্রীসনাতন গোস্বামীকে দিলেন। প্রসাদ পেয়ে শ্রীসনাতন গোস্বামী আনন্দে আত্মহারা! জিজ্ঞাসা করলেন চাল দুধ কোথায় পেলে? শ্রীরূপ বললেন একজন গোপ কুমারী দিয়ে গিয়েছে। শ্রীসনাতন বললেন— হঠাৎ দিয়ে গেল? শ্রীরূপ বললেন হাঁ হঠাৎ দিয়ে গেল, আজ সকাল বেলা আমার ইচ্ছা হল আপনাকে একটু পায়স খাওয়াই, এমন সময় দেখি এক কুমারী সিধা নিয়ে হাজির। এ কথা শুনে শ্রীসনাতনের নয়ন দিয়ে প্রেমাশ্রু পড়তে লাগল, বললেন এত স্বাদিষ্ট দ্রব্য আর কে দিবেন ? শ্রীরাধাঠাকুরাণীই দিয়েছেন। তুমি যেন এরূপ আকাঙ্ক্ষা আর কখন কর না।“শুনিয়া গোস্বামী নিষেধয়ে বারবার।” (ভঃ রঃ সিঃ ১৩।22) “শ্রীশ্রীগোবর্দ্ধনের কৃপা” প্রতিদিন চৌদ্দ মাইল গোবর্দ্ধন-গিরি শ্রীসনাতন গোস্বামী পরিক্রমা করতেন। বার্দ্ধক্য-হেতু তাঁর কষ্ট হত, কিন্তু তিনি নিয়ম ভঙ্গ করতে চাইতেন না। কষ্ট করে পরিক্রমা করতেন। ভক্তের কষ্ট ভগবান্ বুঝতে পারলেন। এক গোপ-শিশুরূপে শ্রীসনাতনের কাছে এলেন, বললেন বাবা! তুমি বৃদ্ধ হয়েছ, এত কষ্ট করে গিরিরাজ পরিক্রমা আর ক'র না। শ্রীসনাতন গোস্বামী বললেন—ইহা আমার নিত্য ভজন—নিয়ম। শ্রীকৃষ্ণ বললেন, বৃদ্ধকালে নিয়ম ত্যাগ কর। শ্রীসনাতন বললেন— নিয়ম কখনও ত্যাগ করা যায় না। শ্রীকৃষ্ণ বললেন— বাবা! আমার কথা মানবে? শ্রীসনাতন বললেন—মাবার মত যদি হয়, মা। শ্রীকৃষ্ণ তখন নিজ পদচিহ্নযুক্ত একটী শিলা খন্ড দিয়ে বললেন—বাবা এটি সাক্ষাৎ গোবর্দ্ধন-শিলা। শ্রীসনাতন বললেন—এ-শিলা আমি কি করব? শ্রীকৃষ্ণ বললেন—এ শিলা পরিক্রমা কর, গিরিরাজ পরিক্রমার ফল পাবে। “শিলা সমর্পিয়া কৃষ্ণ হলেন অদর্শন।” শ্রীসনাতন গোস্বামী অবাক হলেন, তিনি বুঝতে পারলেন গিরিরাজ স্বয়ং দিয়ে গেলেন, সে দিন থেকে তিনি সেই পদচিহ্ন-শিলা পরিক্রমা করতেন। “শ্রীমদনগোপালের দর্শন দান” শ্রীসনাতন গোস্বামী মহাবনে থাকতেন। একদিন যমুনা তটে তিনি শ্রীমদন গোপালকে খেলতে দেখলেন। অবাক হলেন। এ কি সে মদন গোপাল খেলছে না কি? আবার চিন্তা করলেন কোন গোপ-বালক হবে। সে দিন গেল। আর একদিন দেখলেন যমুনার তটে সে শিশুটি অন্যান্য গোপ-শিশুর সঙ্গে খেলছে। শ্রীসনাতন গোস্বামী লক্ষ্য করবার জন্য দাঁড়িয়ে রইলেন। আজ দেখব শিশু কোথায় যায় ।সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এল। খেলা সাঙ্গ করে অন্যান্য গোপশিগুণ চলে গেল। মরনগোপাল মন্দিরে প্রবেশ করলেন। তখন সনাতন গোস্বামী বুঝতে পারলেন, মদনগোপাল প্রতিদিন যমুনা তীরে ক্রীড়া করেন। "ব্রজবাসীগণের স্নেহ" শ্রীসনাতন গোস্বামী ও শ্রীরূপ গোস্বামী যখন প্রজো যে গ্রামে যেতেন সে গ্রামের গোপগণ দু'ভাইকে প্রাণের থেকে অধিক স্নেহ করতেন। গ্রামবাসিগণ তাদের দুই দুধ খাওয়াতেন। গোস্বামিদ্বয় গ্রামবাসিদের সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণ পরিকর মনে করতেন। সে ভাবে তাঁদের সম্মান করতেন। তাঁদের গৃহের যাবতীয় খবর বার্তা জিজ্ঞাসা করতেন। এ সম্বন্ধে শ্রীনরহরি চক্রবর্তী ভক্তিরত্নাকরে লিখেছেন কার কত কন্যা পুত্র বিবাহ কোথায়। কি নাম কাহার-কৈছে প্রবীণ নিৰ্ভয় ।। গাভী বৃষাদিক কত কৃষিকর্ম কার। কার গৃহে শস্য কত, কৈছে ব্যবহার।। শরীর আরোগ্য কার কৈছে মনোবৃত্তি। ঐছে জিজ্ঞাসিতে সবে হন হর্ষ অতি ।। -(ভঃ রঃ ৫। ১৩৬১-১৩৭১ ) গোস্বামীদ্বয় এভাবে ব্রজবাসিদের খবর নিতেন। মাঝে মাঝে তাদের শারীরিক হিতোপদেশ দিতেন; ব্রজবাসিগণের দুঃখের কথা শ্রবণ করে দুঃখী হতেন। সুখের কথা শ্রবণ করে সুখী হতেন ও তাঁদের সঙ্গে হাস্য পরিহাসাদি করতেন। গ্রামে গেলে ব্রজবাসিগণ তাঁদের ছাড়তে চাইতেন না। তাঁদের কয়দিন না দেখলে বড় দুঃখী হতেন। শ্রীরূপ সনাতনের প্রাণ যেমনশ্রীশ্রীগৌর পাষ ব্রজবাসিগণ, তেমনি ব্রজবাসিগণের প্রাণও তাঁরা দুই জন। “বৈষ্ণব-চূড়ামণি শিবের স্নেহ” গোবন্ধনে চাকুলেশ্বর নামক স্থানে শ্রীসনাতন গোস্বামী ভজন করতেন। সেখানে মশকের উৎপাত বড় বেশী হল। মশকের দংশনে বিরক্ত হয়ে, শ্রীসনাতন একদিন বললেন- এখানে আর থাকব না। ভজনও করা যায় না, মহাপ্রভুর সেবা-গ্রন্থ লিখনাদিও হয় না। অন্তৰ্য্যামী শ্রীশিব শ্রীসনাতনের মনের কথা জানতে পেরে রাত্রে শ্রীসনাতনকে স্বপ্নে বললেন- সনাতন। তুমি স্বচ্ছন্দে ভজন ও মহাপ্রভুর সেবা করতে থাক, মশকের উৎপাত কাল থেকে আর থাকবে না। সে দিন থেকে সেখানে মশা আর রইল না, শ্রীসনাতন গোস্বামী নিরুপদ্রবে ভজন করতে লাগলেন। “শ্রীরূপ ও শ্রীসনাতনের রচিত গ্রন্থাবলী” শ্রীসনাতন গোস্বামীকৃত — শ্রীবৃহৎ ভাগবতামৃত, শ্রীহরিভক্তি-বিলাস ও উহার দিগ্বদর্শিনী টীকা, শ্রীকৃষ্ণলীলাস্তব বা দশম চরিত, শ্রীমদ্ভাগবতের টিপ্পনী ও বৃহৎ বৈষ্ণব-তোষণী। শ্রীমরূপগোস্বামীকৃত— হংসদূত, উদ্ধব-সন্দেশ, শ্রীকৃষ্ণজন্ম তিথি ন বিধি, শ্রীরাধাকৃষ্ণ-গণোদ্দেশ দীপিকা (বৃহৎ ও লঘু) শ্রীস্তবমালা। শ্রীবিদগ্ধ মাধব নাটক, শ্রীললিত মাধব নাটক, দানকেলি কৌমুদী, শ্রীভক্তিরসামৃত সিন্ধু, উজ্জ্বল নীলমণি, প্রযুক্তাখ্যাতচন্দ্রিকা, শ্রীমথুরা-মাহাত্ম্য, পদ্যাবলী, নাটক চন্দ্রিকা, সংক্ষেপ ভাগবতামৃত। সামান্য বিরুদাবলী লক্ষণ ও উপদেশামৃত। “শ্রীরূপ ও শ্রীসনাতনের মহিমা গীত” জয় মোর সাধু-শিরোমণি রূপ সনাতন।জিনকে ভক্তি বৃন্দাবন কী প্রীত কৃষ্ণ রাধাতন।। সহজ মাধুরী রৌম রৌম সুখ গান ।। সব তেজি কুঞ্জ কেলি, ভজি অহনিশি:- অতি অনুরাগ রাধাতন । কৃষ্ণচৈতন্য কে কৃপা ফলী দৌ ভ্রাতন ।। সে সুখে তরুবর পাতন ।। এক রস নিরহী করুণা সিন্ধু তিন বিনু ব্যাস অনাথন যে শ্রীচৈতন্য মনোহভীষ্টং স্থাপিতং যেন ভূতলে। সোহয়ং রূপ কদা মহ্যং দদাতি স্বপদান্তিকম্।। শ্রীসনাতন ও শ্রীরূপের জন্ম তারিখ—সজ্জন তোষণী ২য় বর্ষ ২৫পৃঃ (ইং ১৮৮৫) প্রকাশিত আছে যথা— শ্রীসনাতন—জন্ম ১৪১০ শকাব্দ, ১৫৪৪ সম্বৎ, ১৪৮৮ খৃঃ তিনি গৃহে ২৭ বছর ও ব্রজে ৪৩ বছর বাস করেছিলেন। তাঁর প্রকট স্থিতি— ৭০ বছর, অপ্রকট— ১৪৮০ শকাব্দ; ১৬১৫ সম্বৎ, ১৫৫৮ খৃঃ আষাঢ়ী পূর্ণিমায়। শ্রীরূপ—জন্ম ১৪১১ শকাব্দ, ১৫৪৬ সম্বৎ, ১৪৮৯ খৃঃ গৃহে বাস ২২ বছর, ব্রজে—৫১ বছর। শ্রীরাধারমণ ঘেরার মতে— জন্ম ১৪১৫ শকাব্দ, ১৫৫০ সম্বৎ, ১৫৬৮ খৃঃ। প্রকট স্থিতি ৭৫ বছর। তাঁর অপ্রকট ১৪৮৬ শকাব্দ, ১৬২১ সম্বৎ, ১৫৬৪ খৃঃ শ্রাবণী শুক্লাদ্বাদশী ১৫৬৮ খৃঃ মতান্তরে ১৪৯০ শকাব্দ, ১৬২৫ সম্বৎ, ১৫৬৮ খৃঃ। “শ্রীসুবুদ্ধি রায়” শ্রীসুবুদ্ধি রায় পূর্ব্বে গৌড়ের রাজা ছিলেন, হুসেন সাহ এঁর অধীনে ...কাজ করতেন। শ্রীসুবুদ্ধি রায় এক দীঘিকা খনন কার্য্য আরম্ভ করেন। সে কার্য্যের মূশী হলেন হুসেন সাহ। একদিন হুসেন সাহের বিশেষ ভুলেরতাঁকে ত্যাগ করলেন। শ্রীসুবুদ্ধি রায় কাশীতে গেলেন প্রাশ্চিত করছে তাঁর পাপ ক্ষয় হবে কি না পণ্ডিতদের জিজ্ঞাসা করলে, তাঁরা বললেন খেয়ে প্রাণ ত্যাগই এর প্রায়শ্চিত।" শ্রীসুবুদ্ধি রায় কাশীতে রইলেন কিছুদিন । এমন সময় প্রায় ২০৮ র আগমন হল । শ্রীসুবুদ্ধি রায় মহাপ্রভুর শ্রীচরণ দর্শন করলেন। একদিন প্র শ্রীচরণ ধরে প্রায়শ্চিত্তের কথা নিবেদন করলে, মহাপ্রভু বললেন 'এক 'নামাভাসে তোমার পাপ দোষ যাবে। আর নাম লইতে কৃষ্ণচরণ পাইবে।। আর কৃষ্ণনাম লৈতে কৃষ্ণস্থানে স্থিতি। মহাপাতকের হয়। এই প্রায়শ্চিতি ।। -- ( :: মধঃ 1-9 ) অনন্তর মহাপ্রভুর আদেশে শ্রীসুবুদ্ধি রায় বৃন্দাবনে এলেন এবং শুষ্ক কাষ্ঠ আহরণ করে বাজারে বিক্রি করে যে পয়সা পেতেন, তা দিয়ে ছানা কিনে খেয়ে জীবন ধারণ করতেন; দুঃখী বৈষ্ণবদের সেবা করে যেতেন, আর গৌড়দেশ থেকে আগত বৈষ্ণব যাত্রীদের খাওয়াতেন দুই ভাত। শ্রীরূপ গোস্বামী প্রয়াগ থেকে ব্ৰজে এলে শ্রীসুবুদ্ধি রায় তাঁর সঙ্গে মিলিত হলেন। পূর্ব্বে হতেই দু-জনার মধ্যে মধ্যভাৱ ছিল। শ্রীসুবুদ্ধি রায় শ্রীরূপকে দ্বাদশ বন দর্শন করালেন। এইভাবে শ্রীসুবুদ্ধি রায় শ্রীসনাতনের সহিত মিলিত হলে উভয়েরই পরম আনন্দ হল। শ্রীসুবুদ্ধি রায় ব্রাহ্মাণ ও শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন। মহাপ্রভুর উপদেশ অনুসারে শ্রীহরিনাম আশ্রয়পূর্ব্বক, শ্রীব্রজধামে অতি দীনভাবে ও গোস্বামিদিগের সঙ্গে শ্রীভগবদ্ প্রসঙ্গে দিন যাপন করতেন।তাঁকে ত্যাগ করলেন। শ্রীসুবুদ্ধি রায় কাশীতে গেলেন; প্রায়শ্চিত্ত করলে তাঁর পাপ ক্ষয় হবে কি না পন্ডিতদের জিজ্ঞাসা করলে, তাঁরা বললেন – “তপ্ত ঘৃত খেয়ে প্রাণ ত্যাগই এর প্রায়শ্চিত্ত।” শ্রীসুবুদ্ধি রায় কাশীতে রইলেন কিছুদিন। এমন সময় তথায় মহাপ্রভুর আগমন হল। শ্রীসুবুদ্ধি রায় মহাপ্রভুর শ্রীচরণ দর্শন করলেন। একদিন প্রভুর শ্রীচরণ ধরে প্রায়শ্চিত্তের কথা নিবেদন করলে, মহাপ্রভু বললেন এক 'নামাভাসে' তোমার পাপ-দোষ যাবে। আর ‘নাম’ লইতে কৃষ্ণচরণ পাইবে।। আর কৃষ্ণনাম লৈতে কৃষ্ণস্থানে স্থিতি। মহাপাতকের হয় এই প্রায়শ্চিত্তি।। - (চৈঃ চঃ মধ্যঃ ২৫। ১৯৯-২০০) অনন্তর মহাপ্রভুর আদেশে শ্রীসুবুদ্ধি রায় বৃন্দাবনে এলেন এবং শুষ্ক কাষ্ঠ আহরণ করে বাজারে বিক্রি করে যে পয়সা পেতেন, তা দিয়ে চানা কিনে খেয়ে জীবন ধারণ করতেন ; দুঃখী বৈষ্ণবদের সেবা করে যেতেন, আর গৌড়দেশ থেকে আগত বৈষ্ণব যাত্রীদের খাওয়াতেন দই ভাত। শ্রীরূপ গোস্বামী প্রয়াগ থেকে ব্রজে এলে শ্রীসুবুদ্ধি রায় তাঁর সঙ্গে মিলিত হলেন। পূর্ব্বে হতেই দু-জনার মধ্যে সখ্যভাব ছিল। শ্রীসুবুদ্ধি রায় শ্রীরূপকে দ্বাদশ বন দর্শন করালেন। এইভাবে শ্রীসুবুদ্ধি রায় শ্রীসনাতনের সহিত মিলিত হলে উভয়েরই পরম আনন্দ হল। শ্রীসুবুদ্ধি রায় ব্রাহ্মণ ও শাস্ত্রজ্ঞ পন্ডিত ছিলেন। মহাপ্রভুর উপদেশ অনুসারে শ্রীহরিনাম আশ্রয় পূর্ব্বক, শ্রীব্রজধামে অতি দীনভাবে ও গোস্বামিদিগের সঙ্গে শ্রীভগবদ্ প্রসঙ্গে দিন যাপন করতেন। জন্য শ্রীসুবৃদ্ধি রায় তাঁর পৃষ্ঠে বেত্রাঘাত করেন। কালক্রমে হুসেন সাহ গৌড়ের বাদশা হলেন। তখন শ্রীসুবুদ্ধি রায় তাঁর অধীনে কাজ করতে লাগলেন। একদিন হুসেন সাহের বেগম বলেন কেন? তোমার অঙ্গে এরূপ চিহ্ন হুসেন সাহ— কোন কারণে। বেগম — সে কারণ আমায় না বললে আমি আহার করব না। হুসেন সাহ—এ বহুদিনের কথা। কোম—বহুদিনের হলেও আমায় বলতে হবে। হুসেন সাহ—তবে শুন, যখন শ্রীসুবুদ্ধি রায় গৌড়ের রাজা ছিলেন তখন আমি তাঁর অধীনে কাজ করতাম। কোন কাজ বারবার বুঝান হলেও আমি বুঝতে পারছিলাম না। তাই আমাকে বুঝাবার জন্য বেত্রাঘাত করেছিলেন। তাতে আমি কিছু মনে করি নাই। আমার ভালর জন্যই তিনি আমায় মেরেছিলেন। বেগম বললেন—আমি এ সব কথা সইতে পারি না। শ্রীসুবুদ্ধি রায়ের প্রাণ সংহার কর। তবে ভোজন করব। হুসেন সাহ— বেগম। তুমি এ কি কথা বলছ? শ্রীসুবুদ্ধিরায় আমার পালক, পিতৃসদৃশ। তাঁর প্রাণ সংহার করা আমার পক্ষে কখনও উচিত হয় বেগম—যদি তাকে না মার, তার জাতি নাশ কর। বাদশা—জাতি নাশ করলে তিনি প্রাণ ত্যাগ করতে পারেন কোন—তা যদি না হয় আমি নিজেই প্রাণ ত্যাগ করব। বাদশা মহা বিপদে পড়লেন। অনেক চিন্তা করে সুবুদ্ধি রায়কে করোঁয়ার পাশি পান করালেন। শ্রীসুবুদ্ধি রায়ের জাতি নষ্ট হল। ব্রাহ্মণ সমাজতাঁকে ত্যাগ করলেন। শ্রীসুবুদ্ধি রায় কাশীতে গেলেন; প্রায়শ্চিত্ত করলে তাঁর পাপ ক্ষয় হবে কি না পন্ডিতদের জিজ্ঞাসা করলে, তাঁরা বললেন – “তপ্ত ঘৃত খেয়ে প্রাণ ত্যাগই এর প্রায়শ্চিত্ত।” শ্রীসুবুদ্ধি রায় কাশীতে রইলেন কিছুদিন। এমন সময় তথায় মহাপ্রভুর আগমন হল। শ্রীসুবুদ্ধি রায় মহাপ্রভুর শ্রীচরণ দর্শন করলেন। একদিন প্রভুর শ্রীচরণ ধরে প্রায়শ্চিত্তের কথা নিবেদন করলে, মহাপ্রভু বললেন এক 'নামাভাসে' তোমার পাপ-দোষ যাবে। আর ‘নাম’ লইতে কৃষ্ণচরণ পাইবে।। আর কৃষ্ণনাম লৈতে কৃষ্ণস্থানে স্থিতি। মহাপাতকের হয় এই প্রায়শ্চিত্তি।। - (চৈঃ চঃ মধ্যঃ ২৫। ১৯৯-২০০) অনন্তর মহাপ্রভুর আদেশে শ্রীসুবুদ্ধি রায় বৃন্দাবনে এলেন এবং শুষ্ক কাষ্ঠ আহরণ করে বাজারে বিক্রি করে যে পয়সা পেতেন, তা দিয়ে চানা কিনে খেয়ে জীবন ধারণ করতেন ; দুঃখী বৈষ্ণবদের সেবা করে যেতেন, আর গৌড়দেশ থেকে আগত বৈষ্ণব যাত্রীদের খাওয়াতেন দই ভাত। শ্রীরূপ গোস্বামী প্রয়াগ থেকে ব্রজে এলে শ্রীসুবুদ্ধি রায় তাঁর সঙ্গে মিলিত হলেন। পূর্ব্বে হতেই দু-জনার মধ্যে সখ্যভাব ছিল। শ্রীসুবুদ্ধি রায় শ্রীরূপকে দ্বাদশ বন দর্শন করালেন। এইভাবে শ্রীসুবুদ্ধি রায় শ্রীসনাতনের সহিত মিলিত হলে উভয়েরই পরম আনন্দ হল। শ্রীসুবুদ্ধি রায় ব্রাহ্মণ ও শাস্ত্রজ্ঞ পন্ডিত ছিলেন। মহাপ্রভুর উপদেশ অনুসারে শ্রীহরিনাম আশ্রয় পূর্ব্বক, শ্রীব্রজধামে অতি দীনভাবে ও গোস্বামিদিগের সঙ্গে শ্রীভগবদ্ প্রসঙ্গে দিন যাপন করতেন।


SHARE

Milan Tomic

Hi. I’m Designer of Blog Magic. I’m CEO/Founder of ThemeXpose. I’m Creative Art Director, Web Designer, UI/UX Designer, Interaction Designer, Industrial Designer, Web Developer, Business Enthusiast, StartUp Enthusiast, Speaker, Writer and Photographer. Inspired to make things looks better.

  • Image
  • Image
  • Image
  • Image
  • Image
    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment