শ্রীশ্রীগঙ্গাদাস পণ্ডিত
গঙ্গাদাস পণ্ডিত চরণে নমস্কার।
বেদপতি সরস্বতীপতি — শিষ্য যাঁর।।
— শ্রীচৈঃ ভাঃ মধ্যঃ ১। ২৮৩)
শ্রীগৌরসুন্দরের যজ্ঞোপবীত হয়ে গেল। কিছু দিন গৃহে অধ্যয়ন করলেন। বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করবার শিশুর বিশেষ আগ্রহ দেখে শ্রীগঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে দেওয়ার জন্য শ্রীজগন্নাথ মিশ্র শ্রীনিমাইকে সঙ্গে নিয়ে পণ্ডিতের বাটীতে এলেন। শ্রীগঙ্গাদাস পণ্ডিত দ্বাপরে শ্রীসান্দীপনি মুনি ছিলেন। তাঁর কাছে শ্রীরাম ও কৃষ্ণ বিদ্যা অধ্যয়ন করেছিলেন। শ্রীগঙ্গাদাস পণ্ডিত শ্রীজগন্নাথ মিশ্রকে দেখে সম্ভ্রমে উঠে আলিঙ্গন করলেন এবং অতি আদরে আসনে বসালেন। শ্রীজগন্নাথ মিশ্র বললেন— এই পুত্র আপনাকে দিলাম। এঁকে আপনি লেখা পড়া শিখাবেন । শ্রীগঙ্গাদাস পণ্ডিত বললেন – অনেক বড় সৌভাগ্য ছাড়া এইরূপ মহাপুরুষ লক্ষণযুক্ত বালককে পড়ান যায় না। আমার যত শক্তি আছে তদনুসারে এঁকে পড়াব। শ্রীজগন্নাথ মিশ্র বালককে শ্রীগঙ্গাদাস পণ্ডিতের করে সমর্পণ করে ঘরে ফিরে এলেন।
শিষ্য দেখি, পরম-আনন্দে গঙ্গাদাস ৷
পুত্রপ্রায় করিয়া রাখিলা নিজ-পাশ।।
( শ্রীচৈঃ ভাঃ আদি ৮/৩২)
শ্রীগঙ্গাদাস পণ্ডিত দিব্য বালকের অতিমৰ্ত্ত স্বভাবে বুঝঝতে পারলেন এ-শিশু অসাধারণ। ব্রাহ্মণ পুত্রের ন্যায় আদর করে শিষ্যকে অধ্যয়ন করাতে লাগলেন। অলৌকিক মেধাবিশিষ্ট বালক শ্রীনিমাই গঙ্গাদাস পণ্ডিতের নিকট একবার যে সূত্র শুনতেন তা কণ্ঠস্থ হয়ে যেত। টোলে তিনি অল্পদিনের মধ্যেই শীর্ষস্থান অধিকার করলেন। এই সময় দিব্য বালকের অসাধারণ মেধা এইরূপ প্রকাশিত হয়েছিল যে উপাধ্যায় গঙ্গাদাসের ব্যাখ্যার উপরেও স্বয়ং সুন্দর ব্যাখ্যা সিদ্ধান্ত স্থাপন করতেন।
টোলে শত শত শিষ্য তাঁর সঙ্গে কক্ষা করে কেহই পারতেন না। ঈশ্বর যখন যে লীলা করেন তাই সর্ব্বোত্তম। শ্রীগঙ্গাদাস পণ্ডিত দিব্য বালকের অদ্ভুত বুদ্ধি দেখে শিষ্যদিগের মধ্যে তাঁকে শ্রেষ্ঠ করে দেখতেন। শ্রীগঙ্গাদাসের শিষ্যগণ মধ্যে শ্রীকমলাকান্ত, মুরারি গুপ্ত ও শ্রীকৃষ্ণানন্দ প্রভৃতি ছাত্র শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তাঁদের শ্রীগৌরসুন্দর নানাবিধ ফাঁকি জিজ্ঞাসা করতেন।
গঙ্গার ঘাটে ঘাটে গিয়ে তিনি পড়ুয়াদিগের সঙ্গে নানা তর্ক-বিতর্ক করতেন। সূত্র ব্যাখ্যা কালে শ্রীগৌরসুন্দর যে সিদ্ধান্ত স্থাপন করতেন তা পুনরায় খণ্ডন করতেন। খণ্ডিত সিদ্ধান্ত আবার সুন্দরভাবে স্থাপন করতেন। তাঁর এ ধরণের প্রতিভা দেখে পড়ুয়াদের বিস্ময় উৎপাদিত হত। শ্রীগঙ্গাদাস অতিশয় আনন্দ লাভ করতেন। শ্রীনিমাই কিছু দিন শ্রীগঙ্গাদাস পণ্ডিতের নিকট ন্যায় ও অলঙ্কার আদি অভ্যাস করে গুরুদেবের আদেশ নিয়ে স্বয়ং এক ন্যায় বিদ্যালয় আরম্ভ করলেন। শ্রীগৌরসুন্দরের এই বিদ্যাপীঠ হল মুকুন্দ-সঞ্জয়ের দুর্গাপূজার বৃহৎ চণ্ডীমণ্ডপে । শ্রীনিমাই পণ্ডিতের ছাত্র সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে লাগল। অতি অল্প বয়সে ন্যায় শাস্ত্রে শ্রীনিমাই পণ্ডিতের অদ্ভুত ব্যুৎপত্তি দেখে সকলে, এমনকি গঙ্গাদাস পণ্ডিত পৰ্য্যন্ত বিস্মিত হতেন।
হেনমতে শ্রীমুকুন্দসঞ্জয়-মন্দিরে।
বিদ্যারসে বৈকুণ্ঠ নায়ক বিহরে।।
-(শ্রীচৈঃ ভাঃ আদি ১৫।৩২)
কিছুদিন এইরূপ বিদ্যাবিলাস করে জননী শচীকে খুব সুখী করলেন। অনন্তর শ্রীগয়া ধামে গমন করলেন। সেখানে শ্রীমাধবেন্দ্র পুরীর শিষ্য শ্রীঈশ্বর পুরীর থেকে মন্ত্র দীক্ষা গ্রহণ করলেন। দীক্ষা গ্রহণ করবার পর শ্রীগৌরসুন্দর জগতে প্রেমভক্তি প্রকাশ আরম্ভ করলেন। শ্রীগয়াধামে আবশ্যকীয় কৰ্ম্মাদি করে গৃহে ফিরে এলেন। এবার কৃষ্ণ বর্ণন ভিন্ন কিছু বলেন না, জানেনও না। শিষ্যগণের অনুরোধে যদিও পাঠশালায় পড়াতে বসতেন প্রতি সুত্রের কেবল কৃষ্ণপর ব্যাখ্যা করতেন। অগত্যা শিষ্যগণ গুরু গঙ্গাদাস পণ্ডিতের নিকট শ্রীনিমাই পণ্ডিতের সে সময়ের অবস্থা বর্ণন করলেন। গঙ্গাদাস পণ্ডিত সমস্ত কথা শুনলেন। অপরাহ্নকালে শ্রীগৌরসুন্দর যখন শ্রীগঙ্গাদাস পণ্ডিতকে বন্দনা করতে এলেন, তখন তিনি স্নেহে আশীর্ব্বাদ করে বলতে লাগলেন
গুরু বলে, – “বাপ বিশ্বম্ভর শুন বাক্য।
ব্রাহ্মণের অধ্যয়ন নহে অল্প ভাগ্য” ।।
- (শ্রীচৈঃ ভাঃ মধ্যঃ ১। ২৭২)
তোমার মাতামহ নীলাম্বর চক্রবর্ত্তী, পিতা শ্রীজগন্নাথ মিশ্র উভয় কুলে কেউ মুর্খ নাই। ন্যায় শাস্ত্রাদির বাখ্যায় তুমিও পরম যোগ্য। অধ্যাপনা ছাড়লে যদি ভক্তি হয়, তোমার বাপ পিতামহ কি অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়েছিলেন? তাঁরা কি ভক্ত ছিলেন না? এ সব চিন্তা করে তুমি অধ্যয়ন কর। অধ্যয়ন করলে বৈষ্ণব-ব্রাহ্মণ হবে। ব্রাহ্মণ যদি মূর্খ হয় তবে ভাল মন্দ, কেমনে বিচার করবে? এ সব চিন্তা করে তুমি অধ্যয়ন কর এবং ছাত্রদের ভালমত পড়াও। আমি দিব্য করে বলছি তুমি যেন এ বাক্যের অন্যথা কর না।
মহাপ্রভু গুরু গঙ্গাদাস পণ্ডিতের এ সব কথা শুনে বললেন— আপনার শ্রীচরণ-প্রসাদে নবদ্বীপে এমন কেহ নাই যিনি আমার সঙ্গে তর্কে পেরে উঠেন। আমি যে সমস্ত সূত্রের ব্যাখ্যা করব, দেখি নবদ্বীপে কোন্ বড় পণ্ডিত আছেন তা খণ্ডন করতে পারেন? আমি এখনই নগরে গিয়ে পড়াতে আরম্ভ করব। শ্রীগৌরসুন্দরের এই সমস্ত কথা শুনে শ্রীগঙ্গাদাস পণ্ডিত সুখী হলেন। মহাপ্রভু গুরুর চরণ ধূলি নিয়ে পড়াতে চললেন—
আর কিবা গঙ্গাদাসপণ্ডিতের সাধ্য ?
যাঁর শিষ্য—চতুৰ্দ্দশ—ভুবন আরাধ্য।।
— (শ্রীচৈঃ ভাঃ মধ্যঃ ১।২৮৪)
0 comments:
Post a Comment