কুষ্ঠী বাসুদেব বিপ্ৰ
দক্ষিণ দেশে তীর্থ ভ্রমণ করতে করতে মহাপ্রভু কূর্মক্ষেত্রে এলেন। তথায় শ্রীকূর্মবিষ্ণু দর্শন করলেন এবং বহু নৃত্য-গীত করলেন। সেখানে কূর্মনামে এক বৈদিক ব্রাহ্মণ বাস করতেন। মহাপ্রভুকে দর্শন করে তিনি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হলেন এবং হাব-ভাবে অতিমন্ত্র বলে জানলেন। তিনি নম্রভাবে প্রভুকে আমন্ত্রণ করে স্বগৃহে নিয়ে এলেন। পাদ ধৌত করিয়ে সেই জল শিরে ধারণ করলেন। বিপ্র সগোষ্ঠী মহাপ্রভুর শ্রীচরণে আত্মনিবেদন করলেন। তাঁর সেবায় তুষ্ট হয়ে মহাপ্রভু দুই দিবস তথায় অবস্থান করলেন। মহাপ্রভুর প্রভাবে সেখানকার বহু লোক বৈষ্ণব হলেন।
কূর্ম বিপ্রের একজন মিত্র ছিলেন। নাম শ্রীবাসুদেব। তাঁর অঙ্গে গলিত কুষ্ঠ রোগ কিন্তু তাঁর ভক্তির কথা অত্যদ্ভুত। সর্বদা শ্রীকৃষ্ণ স্মরণ-কীৰ্ত্তনে দিন যাপন করত। শরীরের কোন ভান নাই, অভ্যাসে কাজ করছেন।
অঙ্গ হতে যেই কীড়া খসিয়া পড়িয় ।
উঠাঞা সেই কীড়া রাখে সেই ঠাঞ।।
চৈঃ চঃ মধ্যঃ৭। ১৩৭ )
জীবের দুঃখে করুণ হৃদয়, শরীর থেকে কীড়ী পড়ে গেলে তাকে তুলে সেখানে রাখেন। মহাভাগবত বিপ্ৰ যখন শুনতে পেলেন কূর্মবিপ্র গৃহে একজন মহান্ত এসেছেন, তিনি বড় কৃপাময়, সকলকে কৃপা করছেন, তখন বাসুদেব বিপ্র মহাপ্রভুর শ্রীচরণ দর্শন করবার জন্য পরম উৎকণ্ঠা ভরে ছুটে এলেন। ঠিক সেই সময় মহাপ্রভুও কুর্ম বিপ্র থেকে বিদায় নিয়ে চলতে উদ্যত হয়েছেন। এমন সময় বাসুদেব এসে মহাপ্রভুর শ্রীচরণমূলে লুটিয়ে পড়লেন। মহাপ্রভু তাঁকে আলিঙ্গন করতে ছুটে এলেন। বাসুদেব বললেন- হে প্রভো ! আমি মহাপাপী, তদুপরি কুষ্ঠ রোগে পীড়িত, আমাকে স্পর্শ করবেন না। মহাপ্রভু— যে নিরন্তর শ্রীকৃষ্ণ নাম স্মরণ কীৰ্ত্তন আদি করে সে পরম পবিত্র। সে আমার প্রাণ-তুল্য। বাসুদেব— হে দেব। আপনি পরম পবিত্র। আমি অপবিত্র, সকলের ঘৃণার পাত্র। মহাপ্রভু— তুমি অপবিত্র নহ। তোমা স্পর্শে অপবিত্র পবিত্র হয়। এই বলে মহাপ্রভু তাঁকে আলিঙ্গন করতে উদ্যত হ'লেন। বিপ্র একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন দেব! তুমি আমাকে ছুঁয়ো না, ছুঁয়ো না। এই বলে দণ্ডবৎ হয়ে পড়লেন। মহাপ্রভু জোর করে তুলে তাঁকে আলিঙ্গন করলেন।
প্রভুস্পর্শে দুঃখ সঙ্গে কুষ্ঠ দূরে গেল ।
আনন্দ সহিত অঙ্গ সুন্দর হইল ।।
(চৈঃ চঃ মধ্যঃ ৭। ১৪২ )
শ্রীবাসুদেব বিপ্রের কুষ্ঠ রোগ প্রভুর স্পর্শমাত্রই দূর হল। সুবর্ণের প্রতিমার ন্যায় দেহটি সুন্দর হল। মহাপ্রভুর এ কৃপা, এরূপ প্রভাব দেখে লোক চমৎকৃত হলেন। তখন বাসুদেব বিপ্র ভাগবতের একটা শ্লোক কণ্ঠে পাঠ করে স্তব করতে লাগলেন।
ক গদ্গদ্ কাহং দরিদ্রঃ পাপীয়ান্ ক কৃষ্ণঃ শ্রীনিকেতনঃ।
ব্রহ্মবন্ধুরিতি স্মাহং বাহুভ্যাং পরিরম্ভিতঃ।।
(ভাঃ ১০।৮১। ১৬)
হে দীনবন্ধো। আমি পাপী অপরাধী ব্রাহ্মণাধম, তুমি পবিত্রের পবিত্রস্বরূপ সৌন্দর্য্যের ধাম শ্রীলক্ষ্মীপতি, আমাকে বাহুর দ্বারা আলিঙ্গন করলে। হে প্রভো! আমার রোগ দূর করলেন কেন! মহাপ্রভু তুমি আমার একান্ত শরণাগত ভক্ত, তোমার কোন ক্লেশ আমি সইতে পারি না। বাসুদেব— হে ঠাকুর! তুমি আমাকে কৃপা করলে না, বঞ্চনাই করলে। মহাপ্রভু— এর চেয়ে বেশী কৃপা আর কি চাও ! বাসুদেব — প্রভো! এ সব কৃপা না, বঞ্চনা। এখন শরীরের অহঙ্কার হবে। কষ্টে যেরূপ তোমার স্মরণ হয় সুখ-সময়ে সেরূপ হয় না। মহাপ্রভু— তোমার কখনও অভিমান হবে না। নিরন্তর তুমি কৃষ্ণ নাম কর।
কৃষ্ণ উপদেশি কর জীবের নিস্তার।
অচিরাতে কৃষ্ণ তোমা করিবেন অঙ্গীকার।।
(চৈঃ চঃ মধ্যঃ ৭। ১৪৮ )
মহাপ্রভু বাসুদেব বিপ্রকে এই সমস্ত উপদেশ করে তাদের সান্ত্বনা দিয়ে চললেন রামেশ্বরের দিকে।
0 comments:
Post a Comment