শ্রীশ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ: এক চিরস্থায়ী আধ্যাত্মিক প্রভাব
প্রারম্ভিকা
ভগবানের সেবা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান disseminate করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন শ্রীশ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ। তাঁর জীবন এবং কর্ম বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে এক বিশেষ স্থানে অধিষ্ঠিত। আজ আমরা জানবো এই মহৎ পুরুষের জীবন ও তাঁর অবদান সম্পর্কে।
জন্ম ও পরিবার
শ্রীশ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমার একটি ছোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন, প্রায় দেড়শত বছর আগে। একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে তিনি জীবনকে আধ্যাত্মিকতার পথে পরিচালিত করেছিলেন। তাঁর জন্মস্থান আজও তাঁর স্মৃতি ধারণ করে।
গুরুপরম্পরা
শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ গৌড়ীয় বেদাস্তাচার্য্য শ্রীপাদ বলদেব বিদ্যাভূষণের শিষ্য ছিলেন। শ্রীপাদ বলদেব বিদ্যাভূষণের শিষ্য ছিলেন শ্রীউদ্ধব দাস বাবাজী, যিনি শ্রীমধুসূদন দাস বাবাজীর গুরু। শ্রীমধুসূদন দাসের শিষ্য ছিলেন শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ। এই পরম্পরা তাঁকে আধ্যাত্মিক সাধনায় গাইড করেছিল।
শ্রীব্রজমণ্ডলে ভজন
শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ বহু বছর ধরে শ্রীব্রজমণ্ডলে ভজন করেছেন। তাঁর ভজনের জন্য তিনি 'সিদ্ধ বাবা' নামে পরিচিত ছিলেন। ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীমদ্ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর প্রথমবার তাঁর শ্রীচরণ দর্শন করেন বৃন্দাবনে এবং শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজের কাছ থেকে বহু উপদেশ লাভ করেন।
আমলাজোড়া সফর
বঙ্গাব্দ ১৯২৮ সালে ফাল্গুন মাসে শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ আমলাজোড়া গ্রামে শুভ বিজয় করেন। সেই সময় শ্রীমদ্ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর আমলাজোড়া গমন করেন এবং দ্বিতীয়বার শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজীর শ্রীচরণ দর্শন লাভ করেন। শ্রীমদ্ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয়ের নাম প্রচার ও অন্যান্য কার্যক্রমে বিশেষ উৎসাহ দেখে শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ অত্যন্ত সুখী হন।
শ্রীমায়াপুর দর্শন
শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ শ্রীমায়াপুরে এসে শ্রীযোগপীঠ, শ্রীবাস অঙ্গন, এবং মায়াপুরের বিভিন্ন স্থান নির্দেশ করেন। তিনি গৌরজন্মস্থলীতে আনন্দে নৃত্য করেন, যা তাঁর গভীর ভক্তির পরিচায়ক।
সুরভি কুঞ্জে আগমন
১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ কুলিয়া নবদ্বীপ থেকে সুরভি কুঞ্জে শুভাগমন করেন এবং সেখানে আসন গ্রহণ করেন। সুরভি কুঞ্জ তাঁর শুভ বিজয়ে এক অপূর্ব শোভা ধারণ করে।
ভক্তির কর্মকাণ্ড
শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ কুলিয়াতে গঙ্গাতটে বেশিরভাগ সময় ভজন করতেন। তাঁর ভজন কুটির ও সমাধি মন্দির এখনও বিদ্যমান। তিনি শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুরকে তাঁর কুটিরের সামনে ভক্তদের বসবার জন্য একটি চালা নির্মাণ করতে আদেশ করেন, যা ঠাকুর পূর্ণ করেন।
পঞ্জিকা রচনা ও বৈষ্ণব সেবা
শ্রীল সরস্বতী ঠাকুর বার বছর বয়সে জ্যোতিষ শাস্ত্রে বিশেষ পারঙ্গত হন। শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ তাঁকে বৈষ্ণব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চৈতন্যাব্দ, ভগবদ্ সম্পর্কিত মাস, বার তিথি, প্রভৃতি সংবলিত পঞ্জিকা রচনা করতে বলেন। শ্রীল সরস্বতী ঠাকুর তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী শ্রীনবদ্বীপ পঞ্জিকা গণনা শুরু করেন।
সেবার অভ্যাস
শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ কীর্ত্তন ও বৈষ্ণব সেবায় বিশেষ উৎসাহ দেখিয়েছেন। প্রায় একশ পঁইত্রিশ বছর ধরে শ্রীগৌরসুন্দররের বাণী প্রচার করেছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও কীর্ত্তন কালে তাঁকে শ্রীমন্মহাপ্রভুর মতো শক্তিমান মনে হতো।
শিষ্য ও সেবক
শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজের অন্যতম শিষ্য ছিলেন শ্রীভাগবত দাস। তাঁর শিষ্য ছিলেন শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজী মহারাজ। শ্রীল বাবাজী মহারাজের সেবক ছিলেন শ্রীবিহারী দাস, যিনি তাঁর শারীরিক দুর্বলতার কারণে তাঁকে কাঁধে করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যেতেন।
কলকাতা বাস
কলকাতায় এসে শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুরের মানিকতলা স্ট্রীটের বাড়ীতে থাকতেন। অনেকেই তাঁকে তাঁদের বাড়িতে নিতে চাইলে বা ভোজন করাতে চাইলে, তিনি কখনোই তা গ্রহণ করতেন না। বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পেয়েছিল, কিন্তু তিনি দর্শনের জন্য আসা ভক্তদের জন্য প্রণাম গ্রহণ করতেন।
প্রণামী গ্রহণ ও খরচ
সেবক বিহারী দাস প্রণামীগুলি একটি কলসীতে রাখতেন। শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ প্রায়ই হঠাৎ বলতেন, "বিহারী, কত টাকা প্রণামী হয়েছে তা আমাকে দাও।" বিহারী দাস যদি অন্য সেবার জন্য টাকা রেখে দিতেন, তিনি তা গ্রহণ করে বলতেন, "বিহারী, তুমি কেন টাকা রেখেছ? আমার টাকা নিয়ে আয়।" তিনি সেই টাকা নিজের ইচ্ছামত খরচ করতেন।
প্রসাদের প্রসঙ্গ
একবার শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ দুইশত টাকার রসগোল্লা কিনে ধামের গো সেবায় ব্যবহার করেন। তাঁর গঙ্গাতটের তাঁবুতে একটি কুকুরের পাঁচটি বাচ্চা জন্মেছিল। প্রসাদ পেলে, বাচ্চাগুলি প্রসাদ থালার চারপাশে বসে থাকতো। বিহারী দাস যদি কিছু বাচ্চা লুকিয়ে রাখতেন, বাবাজী মহারাজ বলতেন, "বিহারী, তোর খালা নিয়ে যাও, আমি খাব না।"
ভেকু না দেওয়ার নীতি
অনেক লোক শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজের কাছে ভেকু নিতে আসতেন। কিন্তু শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ সবার ভেকু দিতে চাইতেন না, বরং তাদের সেবা করতে বলতেন। একবার শ্রীগৌর হরিদাস নামে একজন ব্যক্তি তিন দিন অনাহারে তাবুর সামনে পড়ে ছিলেন। শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ পরে তাঁকে ভেকু দিতে আদেশ করেন।
ভাগবত পাঠের ব্যবসা
একবার শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজ একজন প্রসিদ্ধ ভাগবত পাঠককে বলেছিলেন, "ভাগবত কীর্ত্তন ব্যবসা একটি বেশ্যা বৃত্তি মাত্র। যারা ভাগবত ব্যবসা করে, তারা নামাপরাধী। তাদের মুখে ভাগবত পাঠ বা কীর্ত্তন শুনতে নাই।" ওই পাঠক এই নির্দেশের পর ভাগবত পাঠের ব্যবসা ত্যাগ করেন এবং পরে বৃন্দাবনে বাস করতে শুরু করেন।
উপসংহার
শ্রীমদ্ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর শ্রীজগন্নাথ দাস বাবাজী মহারাজকে ভক্তদের সেনাপতি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তাঁর জীবন ও কর্ম বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং তাঁর স্মৃতি আজও ভক্তদের হৃদয়ে উজ্জ্বল। তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন আমাদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা এবং তাঁর শিক্ষাগুলি যুগের পর যুগ ধরে আমাদের পথপ্রদর্শক হবে।

0 comments:
Post a Comment