গীতা ২য় অধ্যায় সংখ্য যোগ
সঞ্জয় উবাচ
তং তথা কৃপয়াবিষ্টমপূর্ণাকুলেক্ষণ।
বিষীদমিদং বাক্যমুচ মধুসূদনঃ ॥১৷৷
অনুবাদ—সঞ্জয় বলিলেন—কৃপাপরবশ অশ্রুপূর্ণাকুলদৃষ্টি বিষন্ন অর্জনকে মধুসূদন এই বাক্য বলিতে লাগিলেন ॥১॥
শ্রীভগবানুবাচ
কুতা কশ্মলমিদং বিষমে সমুপস্থিত।
অনাৰ্যজুষ্টমস্বৰ্গমকীৰ্ত্তিকরমজ্জন ॥২৷৷
অনুবাদ—শ্রীভগবান্ বলিলেন, হে অর্জুন! তােমাতে এই ভীষণ বিপদকালে অনাৰ্যসেবিত, স্বর্গপ্রতিষেধক, অকীৰ্ত্তিকর এই মােহ কি হেতু উপস্থিত হইল ?॥২৷৷
ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ পার্থ নৈতৎ ত্ব্যুপপদ্যতে।
ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্বল্যং ত্যক্তোত্তিষ্ঠ পরন্তপ ॥৩৷
অনুবাদ—হে কুন্তীনন্দন পার্থ ! তুমি এইরূপ ক্লীবধৰ্ম প্রাপ্ত হইও না। ইহা তােমাতে শােভা পায় না। হে পরন্তপ ! এই ক্ষুদ্র হৃদয়দৌর্বল্য পরিত্যাগ করিয়া যুদ্ধার্থ উথিত হও ॥৩৷
অৰ্জ্জুন উবাচ
কথং ভীষ্মমহং সংখ্যে দ্রোণঞ্চ মধুসূদন।
ইমুভিঃ প্রতিযােস্যামি পূজাহাবরিসূদন ॥৪৷৷
অনুবাদ—অর্জন বলিলেন—হে অরিসূদন, মধুসূদন! আমি যুদ্ধক্ষেত্রে পূজনীয় ভীষ্ম এবং দ্রোণের বিরুদ্ধে বাণ-দ্বারা কিরূপে যুদ্ধ করিব ? ৪||
গুরূনহত্বা হি মহানুভাবা
শ্রেয়াে ভােক্তং ভৈক্ষ্যমপীহ লােকে।
হত্বার্থকামাংস্তু গুরূনিহৈব
ভুঞ্জীয় ভােগ রুধির প্রদিগ্ধান্ ॥৫৷৷
অনুবাদ—মহানুভব গুরুবর্গকে বধ না করিয়া এই সংসারে ভিক্ষা দ্বারা জীবন যাপন করাও শ্রেয়। কিন্তু গুরুজনদিগকে হত্যা করিলে ইহলােকেই রুধিরাক্ত অর্থকামরূপ ভােগ্য ভােগ করিতে হইবে ॥৫||
ন চৈতদ্বিষ্মঃ কতরঙ্গে গরীয়াে
যা জয়েম যদি বা নাে জয়য়য়ুঃ।
যানে হত্বা ন জিজীবিষাম-
স্তেহবস্থিতাঃ প্রমুখে ধার্তরাষ্ট্রাঃ ॥৬৷৷
অনুবাদ—যুদ্ধে জয় করি কিংবা পরাজিত হই ইহার মধ্যে কোনটি গরীয় তাহা বুঝিতে পারিতেছি না কারণ যাহাদিগকে হত্যা করিয়া আমরা জীবিত থাকিতে চাই না, সেই ধৃতরাষ্ট্রপক্ষীয় লােকেরাই যুদ্ধাৰ্থ সম্মুখে উপস্থিত হইয়াছে ॥
কার্পণ্যদোষােপহতস্বভাবঃ
পৃচ্ছামি ত্বাং ধৰ্ম্মসংস্মৃঢ়চেতাঃ।
যজ্ঞেয়ঃ স্যাক্সিশ্চিতং হি তন্মে
শিষ্যন্তেহহং শাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম্ ॥৭॥
অনুবাদ—স্বাভাবিক শৌর্য্যধৰ্ম্মত্যাগরূপ কার্পণ্যদোষে অভিভূত এবং ধৰ্ম্মনিরূপণে সংমূঢ়চিত্ত আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি—আমার পক্ষে যাহা মঙ্গলকর তাহা নিশ্চিতরূপে উপদেশ করুন। আমি আপনার শিষ্য। আপনার শরণাগত আমাকে শিক্ষা প্রদান করুন ॥ ৭।
ন হি প্রপশ্যামি মমাপনুষ্ঠা
যচ্ছােকমুচ্ছেষণমিল্লিয়াণাম্।
অবাপ্য ভূমাবপত্নমৃদ্ধং
রাজ্যং সুরাণামপি চাধিপত্যম্ ॥৮৷৷
অনুবাদ—পৃথিবীতে নিষ্কণ্টক সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য এবং দেবতাদিগের অধিপতিত্ব পাইয়াও যাহা আমার ইন্দ্রিয়গণের পরিশােষণকারী শােককে দূর করিবে, তাহা আমি প্রকৃষ্টরূপে দেখিতে পাইতেছি না ॥৮||
সঞ্জয় উবাচ
এবমুক্তা হৃষীকেশং গুড়াকেশঃ পরন্তপঃ।
ন যােৎস্য ইতি গােবিন্দমুক্ত। ভূফীং বভুব হ॥৯৷৷
অনুবাদ—সঞ্জয় কহিলেন—পরন্তপ অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে এইরূপ বলিয়া এবং "আমি যুদ্ধ করিব না" ইহা বলিয়া মৌনভাব অবলম্বন করিলেন ৪৯||
তমুবাচ হৃষীকেশঃ প্রহসমিব ভারত।
সেনয়ােভয়াের্মধ্যে বিষীদন্তমিদং বচঃ ॥১০৷৷
অনুবাদ—হে ভারত! উভয়পক্ষীয় সৈন্যগণের মধ্যে বিষাদগ্রস্ত অবস্থায় অবস্থিত অর্জনকে যেন ঈষৎহাস্যসহকারে এইরূপ বাক্য বলিতে লাগিলেন ॥১০ ||শ্রীভগবাজুবাচ
অশােচাশ্বশশাচত্বং প্রজ্ঞাবদাংশ্চ ভাষসে।
গতানগতাসূংশ্চ নানুশােচত্তি পণ্ডিতাঃ ॥১১৷৷
অনুবাদ—শ্রীভগবান্ বলিলেন, তুমি অশােচ্যবিষয়ের নিমিত্ত শােক প্রকাশ করিতেছ আবার পণ্ডিতগণের ন্যায় কথাও কহিতেছ। কিন্তু পণ্ডিতগণ প্রাণহীন বা প্রাণবান্ কাহারও জন্য শােক করেন না ॥১১
ন ত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং নেমে জনাধিপাঃ।
ন চৈব ন ভবিষামঃ সর্বেব বয়মতঃপরম্ ॥১২৷৷
অনুবাদ—আমি—পরমাত্মা ইতঃপূৰ্বে কখনও ছিলাম না ইহা কিন্তু নহে, তুমি অর্জন কখনও ছিলে না, ইহা নহে। এই নরপতিগণ কখনও ছিলেন না, ইহা নহে। ইহার পর আমি, তুমি বা এই নরপতিগণ আমরা সকলে থাকিব না, তাহাও নহে। পরমাত্মা ও জীবাত্মা উভয়ই নিত্য, সুতরাং শােকাতীত ॥ ১২ |
দেহিনােহস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা।
তথা দেহান্তরপ্রাপ্তির্থীরস্ত ন মুহতি ৷৷ ১৩।
অনুবাদ—দেহধারী জীবগণের এই স্থূল শরীরে যে প্রকার কৌমার, যৌবন, বার্ধক্যাবস্থা ক্রমান্বয়ে লাভ হয়, সেই প্রকার দেহান্তর প্রাপ্তিও হইয়া থাকে। বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি তাহাতে অর্থাৎ দেহের নাশ বা উৎপত্তিতে মােহ প্রাপ্ত হন না ॥ ১৩ ||
মাত্ৰাম্পৰ্শাস্তু কৌন্তেয় শীতােষ্ণসুখদুঃখদাঃ।
আগমাপায়িনােহনিত্যান্তাংস্তিতিক্ষস্ব ভারত ॥১৪৷৷
অনুবাদ—হে কুন্তীনন্দন! ইন্দ্রিয়বৃত্তি সমূহের বিষয়সংস্পর্শেই শীত, উষ্ণ, সুখ, দুঃখ দিয়া থাকে। তাহারা আগমপায়ী ও অনিত্য, সুতরাং হে ভারত! তাহাদিগকে সহ্য কর ॥১৪||
যং হি ল ব্যথয়ন্ত্যেতে পুরুষং পুরুষ।
সমদুঃখসুখং ধীরং সােহম্বতায় কল্পভে॥১৫৷
অনুবাদ—হে পুরুষােত্তম ! এই সকল মাত্রা-স্পর্শ, সুখ-দুঃখ-সমজ্ঞান-বিশিষ্ট যে ধীর ব্যক্তিকে ব্যথিত বা অভিভূত করিতে পারে না, তিনি নিশ্চয়ই মােক্ষলাভে অধিকারী ॥১৫||নাসতাে বিদ্যতে ভাবােনাভাবে বিদ্যতে সতঃ।
উভয়ােরপি দৃষ্টোন্তস্তনয়ােস্তত্ত্বদর্শিভিঃ ॥১৬৷৷
অনুবাদ—অনাত্মধৰ্ম্মত্বহেতু আত্মাতে অবিদ্যমান শীতােষ্ণাদির সত্তা নাই এবং নিত্য বস্তু আত্মার বিনাশ নাই। তত্ত্বদর্শী পণ্ডিতগণ সৎ ও অসতের তত্ত্ব আললাচনা করিয়া এইরূপ নির্ণয় করিয়াছেন ॥১৬||অবিনাশি তু তদ্বিদ্ধি যেন সর্বমিদং ততম্।
বিনাশমব্যয়স্যাস্য ন কশ্চিৎ কর্তৃমহতি ॥১৭৷৷
অনুবাদ—যিনি এই সমগ্র শরীর ব্যাপিয়া আছেন তাহাকে অবিনাশী জানিবে। কেহই সেই অব্যয় আত্মার বিনাশ সাধন করিতে সমর্থ নহে ॥১৭||
অন্তবন্ত ইমে দেহা নিত্যস্যোক্তাঃ শরীরিণঃ
অনাশিনোহপ্রমেয়স্য তস্মাদ্ যুধ্যস্ব ভারত।।১৮।।
অনুবাদ—নিত্য অবিনাশী অপরিমেয় জীবাত্মার এই শরীরসকল অনিত্য বলিয়া কথিত হয়। সুতরাং হে ভারত! শাস্ত্রবিহিত স্বধর্ম ত্যাগ না করিয়া যুদ্ধ কর ॥ ১৮ ||
য এনং বেত্তি হন্তারং যশ্চৈনং মন্ততে হত।
উভৌ তো ন বিজানীত নায়ং হস্তি ন হন্যতে৷ ১৯।
অনুবাদ—যে ব্যক্তি জীবাত্মাকে হননকর্তা বলিয়া জ্ঞান করেন এবং যিনি জীবাত্মাকে হত বলিয়া মনে করেন তাহারা উভয়েই কিছুই জানেন না।১৯।
ন জায়তে খ্রিয়তে বা কদাচি
স্নায়ং ভূত্বা ভৰিভা বা ন ভুয়ঃ ।
অজো নিত্যঃ শাখতােবয়ং পুরাণে
ল হতে হলে শরীরে৷ ২০।
অনুবাদ—এই জীবাত্মা কখনও জন্মেন না বা মরেন না অথবা পুনঃ পুনঃ তাহার উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না। তিনি জন্মরহিত, সৰ্ব্বদা একরূপ বলিয়া নিত্য, অপক্ষয়শূন্য, রূপান্তর রহিত অর্থাৎ পুরাতন হইলেও নিত্য নবীন, দেহ বিনষ্ট হইলেও তাহার বিনাশ হয় না। কারণ এই শরীরের সহিত তাহার স্বরূপ-সম্বন্ধুভাব ॥ ২০ |
বেদাবিনাশিনং নিত্যং য এনমজমব্যয়।
কথং স পুরুষঃ পার্থ কং ঘাতয়তি হস্তি কম্ ॥২১
অনুবাদ—হে পার্থ ! যিনি জীবকে নিত্য, অজ, অব্যয় এবং অবিনাশী বলিয়া জানেন, তিনি কি প্রকারে কাহাকেও হত্যা করান বা হত্যা করেন ? |২১||
বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়
নবানি গৃহাতি নরোইপরাণি।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণা-
ন্যানি সংযাতি নবানি দেহী ॥২২৷৷
অনুবাদ—মানুষ যে প্রকার জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া অপর নব বস্তু। পরিধান করে, সেই প্রকার জীবাত্মা জীর্ণ দেহ পরিত্যাগ করিয়া অপর নূতন দেহ ধারণ করিয়া থাকে ॥২২||
নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।
ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপাে ন শােষয়তি মারুতঃ। ২৩।
অনুবাদ—এই জীবাত্মাকে অসকল ছেদন করিতে পারে না। অগ্নি দগ্ধ করিতে পারে না। জল ক্লেদযুক্ত করিতে পারে না এবং বায়ু তাহাকে শুষ্ক করিতে পারে না। ২৩।
অথ চৈনং নিত্যজাতং নিত্যং বা মন্ডসে মৃত।
তথাপি ত্বং মহাবাহাে নৈনং শােচিতুমহসি ॥২৬৷
অনুবাদ—হে মহাবাহো! আরও যদি তুমি জীবাত্মাকে নিত্যজাত বা নিত্য মৃত বলিয়াই মনে কর তাহা হইলেও তুমি এই আত্মার নিমিত্ত শােক করিতে পার না ॥ ২৬ ||
জাত হি ধ্ৰুবাে মৃত্যুঞবং জন্ম মৃতস্য চ।
অম্মাদপরিহাৰ্য্যের্থে ন রূ শােচিতুমর্হসি ॥২৭৷৷
অনুবাদ—যেহেতু জন্ম হইলেই মরণ নিশ্চিত এবং মরণ হইলেও জন্ম নিশ্চিত, সেই হেতু এইরূপ অবশ্যম্ভাবী বিষয়ে শােক করা উচিত নহে ॥২৭।
অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত।
অব্যক্তনিধনাবে তত্র কা পরিদেবনা। ২৮৷৷
অনুবাদ—হে ভারত ! প্রাণিগণের জন্মের পূর্বাবস্থা অজ্ঞাত, জন্মের পর মধ্যকাল জ্ঞাত আর মরণের পরও অজ্ঞাত সুতরাং তদ্বিষয়ে শোকের কি কারণ আছে ? || ২৮ ||
আশ্চৰ্যবৎ পশ্যতি কশ্চিদেন-
মাশ্চৰ্য্যব বদতি তথৈব চান্যঃ।
আশ্চৰ্যবচ্চৈনমন্যঃ শৃণােতি
ত্বাপপ্যনং বৈদন চৈব কশ্চিৎ ॥ ২৯৷
অনুবাদ—কেহ এই আত্মাকে আশ্চৰ্যজনকভাবে দেখেন, সেইরূপ অন্য কেহ বিস্ময়ের সহিত বলেন, এবং অন্য কেহ আশ্চৰ্যবৎ শ্রবণ করেন, কেহ আবার শুনিয়াও ইহাকে সম্যক জানিতে পারেন না। ২৯ |
দেহী নিত্যমধ্যোহয়ং দেহে সর্বস্ত ভারত।
তস্মাৎ সর্বাণি ভূতানি ন ত্ব শােচিতুমহসি ॥ ৩০ |
অনুবাদ—দেহধারী এই জীবাত্মা সকল দেহেই নিত্য অবধ্যরূপে বিরাজিত, সুতরাং ভূতগণের জন্য তােমার শােক করা উচিত নহে। ৩০ ||
স্বধৰ্ম্মমপি চাবেক্ষ্য ন বিকম্পিতুমর্হসি।
ধদ্ধি যুদ্ধাস্ক্রেয়ােহন্য ক্ষত্রিয়স্য ন বিদ্যতে ॥৩১।
অনুবাদ—আর স্বধর্মও আলােচনা করিলে তুমি এইপ্রকার বিচলিত হইতে পার না। কেন না, ক্ষত্রিয়ের পক্ষে ন্যায়-যুদ্ধ অপেক্ষা অন্য মঙ্গলকর কাৰ্য্য নাই ॥ ৩১ |
যদৃচ্ছয়া চোপপম্নং স্বর্গদ্বারপাবৃত।
সুখিনঃ ক্ষত্রিয়াঃ পার্থ লভন্তে যুদ্ধমীদৃশম্ ॥৩২৷৷
অনুবাদ—হে পার্থ ! যদৃচ্ছাক্রমে উপস্থিত এবং অপাবৃতস্বর্গদ্বার-স্বরূপ ঈদৃশ যুদ্ধ সুখশালী ক্ষত্রিয়গণই লাভ করিয়া থাকে ॥৩২||
অথ চেমিমং ধৰ্জং সংগ্রামং ন করিষ্যসি।
ততঃ স্বধর্মং কীৰ্ত্তি হিত্তা পাপমবাসি ॥৩৩
অনুবাদ—পক্ষান্তরে যদি তুমি এই ধর্মানুমােদিত যুদ্ধ না কর তাহা হইলে অধৰ্ম্ম এবং কীর্তি ত্যাগ করিয়া পাপ লাভ করিবে ৩৩
অকীর্তিঞ্চাপি ভূতানি কথয়িষ্যন্তি তেইব্যয়াম্।
সম্ভাবিতস্য চাকীৰ্ত্তিমরণাদতিরিচ্যতে ॥৩৪৷৷
অনুবাদ—সকল লােকই তােমার অক্ষয়-অকীর্তির কথা ঘােষণা করিবে। সম্মানিত ব্যক্তির অখ্যাতি মরণাপেক্ষাও অধিকতর ॥৩৪||
ভয়াদ্রণাদুপরতং মংস্যন্তে ত্বাং মহারথাঃ।
যেষাঞ্চ ত্বং বহুমতাে ভূত্বা যাস্তসি লাঘবম্ ॥৩৫||
অনুবাদ—দুৰ্য্যোধনাদি মহারথগণ তােমাকে ভয়প্রযুক্ত যুদ্ধ হইতে বিরত বলিয়া মনে করিবেন। যাহাদের নিকট তুমি এতকাল বহুমানিত, তাহারাই তােমাকে লঘু জ্ঞান করিবেন ॥৩৫||
অবাচ্যবাদাংশ্চ বহু বদিষন্তি তবাহিতাঃ।
নিস্তব সামর্থং তত দুঃখতরং সু কিম্ ? ॥৩৬৷৷
অনুবাদ—তােমার অরিগণ তােমার সামর্থ্যের নিন্দা করতঃঅকথ্য অনেক কথা বলিবে। ওহে! তাহা অপেক্ষা অধিকতর দুঃখের বিষয় আর কি হইতে পারে ? [৩৬]
হততা বা প্রাঙ্গ্যসি স্বর্গং জিত্বা বা তােক্ষ্যসে মহীম্।
তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ ॥ ৩৭।
অনুবাদ—হে কুন্তী-নন্দন! তুমি যুদ্ধে হত হইলে স্বর্গলাভ করিবে কিংবা জয়ী হইলে পৃথিবী ভােগ করিবে। অতএব সংকল্পবদ্ধ হইয়া যুদ্ধের নিমিত উখিত হও [৩৭]
সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ে
ততাে যুদ্ধায় যুজ্যম্ব নৈবং পাপমবাষ্প্যসি ॥৩৮।
অনুবাদ—সুখ-দুঃখ, লাভালাভ এবং জয় ও পরাজয়কে সমান জ্ঞান করিয়া যুদ্ধার্থ উদ্যোগী হও, তাহা হইলে পাপ হইবে না ॥৩৮||
এষা তেইভিহিত সাংখ্যে বুদ্ধির্যোগে ত্বিমাং শৃণু।
বুদ্ধা যুক্তো যয়া পার্থ কৰ্ম্মবন্ধং প্রহাসি ॥৩৯৷৷
অনুবাদ—হে পার্থ ! সাংখ্যজ্ঞানের কথা তােমাকে কথিত হইল। কিন্তু এক্ষণে ভক্তিযােগ-সম্বন্ধিনী বুদ্ধির কথা শ্রবণ কর। যে বুদ্ধিযােগ লাভ করিলে সংসার সম্যক্রূপে ত্যাগ করিতে সমর্থ হইবে ॥৩৯||
নেহাভিক্রমনাশশাস্তি প্রত্যবায়াে ন বিদ্যতে।
স্বল্পমপ্যশ্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতাে ভয়াৎ। ৪০।
অনুবাদ—এই ভক্তিযােগে অনুষ্ঠান আরম্ভ-মাত্রের নিস্ফলতা নাই বা ইহাতে প্রত্যবায়ও নাই। ইহার অল্প অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠানকারীকে সংসাররূপ মহাভয় হইতে ত্রাণ করিয়া থাকে । ৪০ |
ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিরেকেহ কুরুনন্দন।
বহুশাখা হনন্তাশ্চ বুদ্ধয়ােহব্যবসায়িনা ৷ ৪১।
অনুবাদ—হে কুরুনন্দন! ভক্তিমার্গে নিশ্চয়াত্মিকা-বুদ্ধি একবিষয়িণী বহুশাখা হইয়া থাকে। কিন্তু ভক্তিবহির্মুখগণের বুদ্ধি অনন্ত ও যুক্ত। ৪১।শামিমাং পুষ্পিতাং বাচং প্রবদন্ত্যবিপশ্চিতঃ।
বেদবাদরঃ পার্থ নাতদন্তীতি-বাদিনঃ ॥৪২৷৷
অনুবাদ—যাহারা মূখ বেদের অর্থবাদে রত, স্বর্গাদি ফল ব্যতীত অন্য ঈশ্বরতত্ত্ব নাই, এইরূপ প্রজল্পকারী তাহারা আপাততঃ মনােরম, পরিণামে বিষময় পুষ্পিত বাক্যকে প্রকৃষ্ট বেদবাক্য বলিয়া কীর্তন করিয়া থাকে [৪২||
কামাত্মনঃ স্বর্গপরা জন্মকৰ্ম্মফলপ্রদাম্।
ক্রিয়াবিশেষবহুলাং ভােগৈশ্বৰ্য্যগতিং প্রতি ॥৪৩৷৷
অনুবাদ--অতএব তাহারা কামাত্মা, স্বর্গপ্রার্থী, জন্মকৰ্ম্মফলপ্রদ। ভােগৈশ্বৰ্য্য-প্রাপ্তি-সাধনীভূত ক্রিয়াবিশেষ-প্রচুর বাক্যসকল বলিয়া থাকে ॥৪৩৷৷ভােগশ্বৰ্যপ্রসক্তানাং তয়াপহৃতচেতসাম্।
ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিঃ সমাধৌন বিধীয়তে ॥৪৪৷৷
অনুবাদ—সেই মধুপুস্পিত বাক্যের দ্বারা যাহাদের চিত্ত অপহৃত, সেই ভােগৈশ্বৰ্য্যে আসক্ত জনগণের সমাধিতে অর্থাৎ ভগবানে নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি সমাহিত হয় না ॥৪ ৪||
ত্রৈগুণ্যবিষয় বেদা নিস্ত্রেগুণ্যো ভবাৰ্জন।
নিৰ্বন্দো নিত্যসত্ত্বস্থাে নিৰ্যোগক্ষেম আত্মবান্ ॥৪৫৷৷
অনুবাদ—হে অর্জন! তুমি বেদোক্ত ত্রৈগুণ্যবিষয় পরিত্যাগ করিয়া নিগুণ তত্ত্বে প্রবেশ কর, গুণময় মানাপমানাদি রহিত হও। নিত্যসত্ত্ব আমার ভক্তগণের সঙ্গ কর। মদ্দত্ত বুদ্ধিযােগ লাভ করিয়া যােগ ও ক্ষেমের অনুসন্ধান রহিত হও || ৫||
যাবানর্থ উদপানে সর্বতঃ সংগ্ধতােদকে।
তাবা সর্বেষু বেদেষু ব্রাহ্মণস্য বিজানতঃ ॥৪৬৷৷
অনুবাদ—কৃপাদি ক্ষুদ্র জলাশয়ে যে সকল পৃথক পৃথক্ প্রয়ােজন সিদ্ধ হয়, এক মহাজলাশয়ে সেই সকল প্রয়ােজন সিদ্ধ হইয়া থাকে। সেই প্রকার বেদোক্ত বিভিন্ন দেবতাগণের উপাসনার দ্বারা যে যে ফল সিদ্ধ হয়, ভগবদুপাসনাদ্বারা বেদতাৎপৰ্যবিদ ভক্তিযুক্ত ব্রাহ্মণের সেই সকল-ফলই লাভ হইয়া থাকে ॥৪৬||
কণ্যেবাধিকারন্তে মা ফলেষু কদাচন।
মা কৰ্ম্মফলহেতুভুক্ষ্মা তে সঙ্গোহত্ত্বকৰ্ম্মণি ॥ ৪৭।
অনুবাদ—তােমার স্বধর্মবিহিত কৰ্ম্ম করিবার অধিকার আছে। কিন্তু কৰ্ম্মফলে অধিকার নাই। তুমি কাম্য কৰ্ম্ম করিয়া কৰ্ম্মফলের হেতু হইও না। স্বধৰ্ম্মোচিত কৰ্ম্ম অকরণে তােমার নিষ্টা যেন না হয় । ৪৭ |
যােগস্থঃ কুরু কৰ্ম্মাণি সঙ্গং ভ্যক্তা ধনঞ্জয়।
সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ সমম ভূত্বা সমত্বং যােগ উচ্যতে ॥৪৮
অনুবাদ—হে ধনঞ্জয়! ফলকামনাত্যাগপূৰ্ব্বক ভক্তিযােগযুক্ত হইয়া স্বধর্ম-বিহিত কৰ্ম্ম কর। কৰ্ম্মফলের সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে সমজ্ঞানই যােগ বলিয়া কথিত হয় ॥৪৮
দূরেণ হবরং কৰ্ম্ম বুদ্ধিযােগান্ধনঞ্জয়।
যুদ্ধে শরণমন্বিচ্ছ কৃপণাঃ ফলহেতবঃ ॥৪৯৷৷
অনুবাদ—বুদ্ধিযােগযুক্ত ব্যক্তি ইহজন্মেই সুকৃত ও দুষ্কৃত উভয়ই পরিত্যাগ করিয়া থাকেন। সেইহেতু নিষ্কাম-কৰ্ম্মযােগের নিমিত্ত যত্ন কর। উদাসীনত্বের সহিত বুদ্ধিযােগায়ে কর্ম করাই কৰ্ম্মযােগের কৌশল । ৫০ |
কর্মজং বুদ্ধিযুক্তা হি ফলং ত্যক্ত। মনীষিণঃ ।
জন্মবন্ধবিনিমুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময়ম্ ॥ ৫১।
অনুবাদ—বুদ্ধিযােগযুক্ত মনীষিগণ কর্মজনিত-ফল ত্যাগ করিয়া জন্মবন্ধন বিনিম্মুক্ত হয় এবং ক্লেশরহিত বৈকুণ্ঠে গমন করে । ৫১
যদা তে মােহকলিলং বুদ্ধিতিতরিস্থতি।
তদা গম্ভাসি নিৰ্বেদং শ্রোতব্যস্ত শ্রুতস্য চ। ৫২।
অনুবাদ—যে সময়ে তােমার অন্তঃকরণ মােহরূপ-গহনকে বিশেষরূপে অতিক্রম করিতে পারিবে, সেই সময়ে তুমি শ্রোতব্য ও শ্রুত-ফলে নিৰ্বেদ প্রাপ্ত হইবে ॥ ৫২।তিবিপ্রতিপন্না তে যদা স্থাস্ততি নিশ্চল।
সমাধাবচলা বুদ্ধিস্তদা যােগমস্যসি ॥ ৫৩।
অনুবাদ—যখন তােমার বুদ্ধি নানাবিধ লৌকিক ও বৈদিক অর্থ শ্রবণে বিরক্ত এবং অন্যাসক্তি-বিরহিত হইয়া পরমেশ্বরে স্থিরভাবে থাকিবে তখন যােগফল লাভ করিবে । ৫৩ |
অর্জুন উবাচ
স্থিতপ্রজ্ঞস্য কা ভাষা সমাধিস্থন্য কেশব।
স্থিতধীঃ কিং প্রযেত কিমাসীত ব্ৰজেত কিম্ ? [৫৪৷
অনুবাদ—অর্জুন বলিলেন,-কেশব! সমাধিতে অবস্থিত স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির লক্ষণ কি ? এবং তিনি কিরূপ কথা বলেন, কিরূপে অবস্থান করেন এবং কি ভাবে বিচরণ করেন ? ৫৪
শ্রীভগবানুবাচ
প্ৰজহাতি যদা কামা সৰ্বান পার্থ মনােগতা।
আত্মবােত্মনা তুষ্ট স্থিতপ্রজ্ঞদোচ্যতে ॥ ৫৫।
অনুবাদ—শ্রীভগবান্ বলিলেন, হে পার্থ ! যখন জীব মনােগত সমস্ত কাম পরিত্যাগ করেন এবং প্রত্যাহৃত মনে আনন্দস্বরূপ আত্মার দ্বারা তুষ্ট হন, তখন তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ বলিয়া কথিত হন। ৫৫।
দুঃখেনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখে বিগতস্পৃহঃ।
বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীমুনিরুচ্যতে। ৫৬।
অনুবাদ—আধ্যাত্মিকাদি তাপত্ৰয় উপস্থিত হইলে অনুদ্বিগ্নচিত্ত, সুখ-সাধক বস্তু পাইলেও তৃষ্ণারহিত, রাগ, ভয় ও ক্রোধশূন্য মুনিই স্থিতপ্রজ্ঞ বলিয়া কথিত হন। ৫৬।
যঃ সর্বত্রানভিস্নেহস্তত্ত প্রাপ্য শুভাশুভ।
নাভিনন্দতি ন দ্বেষ্টি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত ॥ ৫৭।
অনুবাদ—যিনি সর্বত্র স্নেহশূন্য এবং শুভ অর্থাৎ অনুকুল-বিষয় লাভ করিয়া আনন্দ এবং অশুভ অর্থাৎ প্রতিকূল-বিষয় লাভ করিয়া নিন্দা করেন না, তাহার বুদ্ধি স্থিরা অর্থাৎ তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ ॥ ৫৭
যদা সংহরতে চায়ং কুম্মোহঙ্গানী সর্বশঃ।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্ৰিয়াৰ্থেভ্যস্ত প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত ॥৫৮৷
অনুবাদ—যখন এই মুনি কূৰ্ম্মের অঙ্গসমূহকে ইচ্ছানুসারে স্বান্তরে গ্রহণের ন্যায় শব্দাদি-ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় হইতে ইন্দ্রিয়গণকে স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করিতে পারেন তখন তাহার প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা অর্থাৎ তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ ॥৫৮
বিষয়া বিনিবৰ্ত্তন্তে নিরাহারস্য দেহিন।
রসবর্জং রসােহপ্য পরং দৃষ্ট। নিবর্ততে ॥৫৯৷
অনুবাদ—ইন্দ্রিয়-দ্বারা বিষয়গ্রহণে অসমর্থ দেহাভিমানী অজ্ঞ ব্যক্তির বিষয়সকল নিবৃত্ত হয়; কিন্তু তাহাতে রস বা রাগ বর্জন হয় না অর্থাৎ বিষয়াভিলাষ নিবৃত্ত হয় না। অথচ স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির পরমাত্মাকে দর্শন করিয়া বিষয়ানুরাগও স্বতঃ নিবৃত্ত হইয়া থাকে ॥৫৯
যততত হপি কৌন্তেয় পুরুষ বিপশ্চিতঃ।
ইন্দ্রিয়াণি প্রমাথীনি হরস্তি প্রসভং মনঃ ॥ ৬০ |
অনুবাদ—হে কৌন্তেয় ! (যেহেতু) আবােহপথে যত্নশীল বিবেকী পুরুষেরও ক্ষোভকারী-ইন্দ্রিয়সকল তাহার মনকে বলপূর্বক বিষয়ে আকর্ষণ করে || ৬০ |
তানি সর্বাণি সংযম্য যুক্ত আসীত মৎপরঃ।
বশে হি যশ্যেন্দ্রিয়াণি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত। ৬১ ॥
অনুবাদ—(সেইহেতু) মৎপরায়ণ ভক্তিযােগ যুক্তবৈরাগ্যাশ্রয়ে ইন্দ্রিয়গণকে সংযম পূৰ্ব্বক মদাশ্রিত হইয়া অবস্থান করিবেন। যেহেতু যাহার ইন্দ্রিয়গণ বশীভূত, তাহারই প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা অর্থাৎ তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ || ৬১ |
ধ্যায়তত বিষয়া পুংসঃ সঙ্গন্তেমূপজায়তে।
সঙ্গাৎ সংজায়তে কাম কামাৎ ক্রোধােহভিজায়তে। ৬২
অনুবাদ—শব্দাদি-বিষয়সমূহ নিরন্তর ধ্যান করিতে করিতে ধ্যানকারী পুরুষের তাহাতে আসক্তি জন্মে। আসক্তি হইতে কাম এবং কাম হইতে ক্রোধের উৎপত্তি হয় ॥ ৬২ |
ক্রোধাদ্ভবতি সম্মােহঃ সমােহাৎ স্মৃতিবিমঃ।
স্মৃতিভ্রংশা বুদ্ধিনাশশা বুদ্ধিনাশা প্রণতি ॥ ৬৩ ৷৷
অনুবাদ—ক্রোধ হইতে সম্মােহ, সম্মােহ হইতে শাস্ত্রোপদিষ্ট স্বার্থের স্মৃতি-নাশ। স্মৃতিনাশ হইতে বুদ্ধিনাশ। বুদ্ধিনাশ হইতে সৰ্ব্বনাশ অর্থাৎ সংসারকূপে পতিত হয় ॥ ৬৩ |
রাগদ্বেষবিমুক্তৈন্তু বিষয়ানিন্দ্রিয়ের।
আত্মবশৈর্বিধেয়াত্মা প্রসাদমধিগচ্ছতি ॥ ৬৪।
অনুবাদ—যুক্তবৈরাগ্যশ্রয়ে রাগন্বেষরহিত আত্মাধীন ইন্দ্রিয়গণের দ্বারা যথাযােগ্য বিষয় ভােগ করিয়াও বিধেয়াত্মাপুরুষ কিন্তু চিত্তের প্রসন্নতা লাভ করিয়া থাকেন ॥ ৬৪||
প্রসাদে সর্বদুঃখানাং হানিরস্যোপজায়তে।
প্রসন্নচেতসস হাশু বুদ্ধিঃ পৰ্য্যবতিষ্ঠতে৷৷ ৬৫।
অনুবাদ-চিত্তপ্রসাদ লাভ হইলে বিধেয়াত্মা পুরুষের সকল দুঃখের নাশ হয়। প্রসন্নচিত্ত অর্থাৎ ভক্তের বুদ্ধি শীঘ্রই স্বীয় অভীষ্টের প্রতি সৰ্ব্বততভাবে স্থির হয় ॥ ৬৫ ॥
নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য ন চাযুক্তস্য ভাবনা।
ন চাভাবয়তঃ শান্তিরশান্ত কুতঃ সুখম্। ৬৬।
অনুবাদ—যে ব্যক্তির মন বশীভূত হয় নাই, তাহার আত্মবিষয়িণীপ্রজ্ঞা নাই। তাদৃশপ্রজ্ঞারহিতের পরমেশ্বর-ধ্যান হয় না। এবং ধ্যানহীনের শান্তি নাই। শান্তিহীন ব্যক্তির আত্মানন্দ কোথায় ? | ৬৬ ||
ইন্দ্রিয়ানাং হি চরতাং যন্তনােহনুবিধীয়তে।
তদস্য হরতি প্রজ্ঞাং বায়ুর্নাবমিবাসি॥৬৭॥
অনুবাদ—বিষয়বিচরণশীল স্বেচ্ছাচারী ইন্দ্রিয়গণের মধ্যে যে কোন একটা ইন্দ্রিয়ের প্রতি মন অনুগমন করিয়া থাকে, সেই ইন্দ্রিয়ই কর্ণধারহীন সমুদ্রে নিমজ্জিত নৌকা, বায়ুর দ্বারা বিচলিত হইবার ন্যায়, অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তির বুদ্ধিকে বিচলিত করিয়া থাকে ॥ ৬৭॥
তম্মাদ যস্য মহাবাহাে নিগৃহীতানি সর্বশঃ।
ইন্দ্রিয়াণীন্তিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত ॥ ৬৮॥
অনুবাদ—হে মহাবাহাে! অতএব যাহার ইন্দ্রিয়গণ ইন্দ্রিয়ভােগ্য- বিষয় হইতে প্রত্যাহৃত হইয়াছে, তাহার প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা অর্থাৎ তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ ॥ ৬৮॥
যা নিশা সর্বভূতানাং তস্যাং জাগৰ্ত্তি সংযমী।
যস্যাং জাগ্ৰতি ভূতানি সা নিশা পশতাে মুনেঃ ॥৬৯৷৷
যস্যাং জাগ্ৰতি ভূতানি সা নিশা পশতাে মুনেঃ ॥৬৯৷৷
অনুবাদ—যে আত্মপ্রবণা-বুদ্ধি জড়মুগ্ধ সাধারণ জীবের নিকট রাত্রিবিশেষ, স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি তাহাতে জাগরিত থাকেন। এবং যে বিষয়প্রবণবুদ্ধিতে সাধারণ জীবগণ জাগরিত থাকে, তত্ত্বদর্শী মুনির নিকট তাহাই রাত্রি-স্বরূপ অর্থাৎ তিনি নির্লিপ্তভাবে যথাযােগ্য বিষয় স্বীকার করেন ॥৬৯॥
আপূৰ্যমাণমচলপ্রতিষ্ঠং
সমুদ্রমাপঃ প্রবিশন্তি যৎ।
তদ্বৎ কামা যং প্রবিশন্তি সর্বে
স শান্তিমাপ্নোতি ন কামকামী ॥৭০॥
অনুবাদ—সম্যক্ পরিপূর্ণ ও অনতিক্রান্তমৰ্যাদ সমুদ্রে যেরূপ অন্যান্য জল প্রবেশ করিয়া থাকে ( কিন্তু ক্ষোভিত করিতে পারে না); তদ্রুপ কামসমূহ স্থিতপ্রজ্ঞ মুনিতে প্রবেশ করিলেও (ক্ষুব্ধ করিতে পারে না। তিনি শান্তি বা জ্ঞানলাভ করিয়া থাকেন, কিন্তু কামকামী ব্যক্তি শান্তি বা জ্ঞানলাভ করিতে পারে না ॥ ৭০ ||
বিহায় কামান্যঃ সৰ্বান পুমাংশ্চরতি নিস্পৃহঃ।
নিৰ্মমাে নিরহঙ্কারঃ স শান্তিমধিগচ্ছতি ॥৭১॥
অনুবাদ—যে পুরুষ সমস্ত কাম পরিত্যাগ করিয়া নিস্পৃহ, নিরহঙ্কার এবং মমতাশূন্যভাবে বিষয় স্বীকারপূর্বক বিচরণ করেন তিনি (স্থিতপ্রজ্ঞ) শান্তিলাভ করিয়া থাকেন ॥ ৭১।
এষা ব্ৰাহ্মী স্থিতিঃ পার্থ নৈনং প্রাপ্য বিমুহতি।
স্থিত্বহস্যমন্তকালেহপি ব্ৰহ্মনির্বাণমৃচ্ছতি। ৭২॥
অনুবাদ—হে কৌন্তেয় ! এই প্রকার ব্রহ্মপ্রাপিকা স্থিতিকে ব্রাহ্মীস্থিতি বলে। এই স্থিতি লাভ করিলে কেহ মােহপ্রাপ্ত হন না। মৃত্যুকালেও ক্ষণ-কালের জন্য ইহাতে অবস্থান করিতে পারিলেও ব্রহ্মনিৰ্বাণ লাভ ঘটে ॥৭২॥
0 comments:
Post a Comment