অর্জুন উবাচ
মগ্রহায় পরমং গুমধ্যাত্মসংজ্ঞিত।
বয়ােক্তং বচনে মােহইয়ং বিগত মম॥১॥
অনুবাদ—অর্জুন কহিলেন, আমাকে অনুগ্রহ করিবার নিমিত্ত পরম গুহ অধ্যাত্মসংজ্ঞিত যে কথা তুমি বলিয়াছ, তাহাতে আমার মােহ বিদূরিত হইল ॥১॥
ভৰাপ্যয়ৌ হি ভূতানাং শ্রুতে বিস্তরশাে ময়া।
ত্বত্তঃ কমলপত্রাক্ষ মাহাত্ম্যমপি চাব্যয়ম্ ॥২॥
ত্বত্তঃ কমলপত্রাক্ষ মাহাত্ম্যমপি চাব্যয়ম্ ॥২॥
অনুবাদ- হে কোমলপত্রাক্ষ !তোমার নিযুক্ত হইতেই জীবগণের সৃষ্টি ও সংহারের বিষয় বিস্তৃতরূপে শ্রবণ করিলাম এবং তােমার অব্যয় মহিমাও শুনিলাম || ২||
এবমেত যথাথ ত্বমাত্মানং পরমেশ্বর।
দুষ্টুমিচ্ছামি তে রূপমৈশ্বরং পুরুষােত্তম । ৩।
অনুবাদ—হে পরমেশ্বর ! তােমার সম্বন্ধে যেরূপ বলিয়াছ, তাহা সেই রূপই, তথাপি হে পুরুষােত্তম ! আমি তােমার ঐশ্বৰ্য্যময়রূপ দর্শন করিতে ইচ্ছা করি ॥ ৩॥
মন্তসে যদি তুচ্ছক্যং ময়া দুষ্টুমিতি প্রভাে৷
যােগেশ্বর ভততা মে ত্বং দর্শয়ানমব্যয়ম। ৪।
অনুবাদ—হে প্রভাে! যদি তােমার সেই রূপ, আমাকর্তৃক দর্শন করিবার যােগ্য মনে কর, তাহা হইলে হে যােগেশ্বর! তুমি আমাকে তােমার নিত্য-স্বরূপ দর্শন করাও | ৪ ||
শ্রীভগবান্ উবাচ
পন্য মে পার্থ রূপাণি শতশােইথ সহস্রশঃ।
নানাবিধানি দিব্যানি নানাবণাকৃতীনি চ ৷৷ ৫।
অনুবাদ—শ্রীভগবান্ কহিলেন,—হে পার্থ ! তুমি আমার বহু প্রকার এবং বিবিধবর্ণ ও আকৃতিসম্পন্ন শত-শত, সহস্র-সহস্র অলৌকিক রূপসমূহ দর্শন কর ৷৷ ৫।
পশ্যাদিতা বসূ রুদ্রানশ্বিনৌ মরুতস্তথা।
বহুন্যদৃষ্টপূর্বাণি পাশ্চৰ্য্যাণি ভারত ৷৷ ৬ ৷৷
অনুবাদ—হে ভারত ! তুমি আদিত্যগণকে, বসুগণকে, রুদ্রগণকে, অশ্বিনীকুমারদ্বয় তথা মরুগণকে দর্শন কর, পূৰ্বে দেখ নাই এমন বহু অদ্ভুত রূপ দর্শন কর | ৬ |
ইহৈকং জগৎ কৃৎস্নং পশ্যাদ্য সচরাচরম্।
মম দেহে গুড়াকেশ যচান্য দ্রষ্ট মিচ্ছসি॥৭॥
অনুবাদ—হে গুড়াকেশ ! আমার এই দেহে একদেশে অবস্থিত চরাচর সমগ্র বিশ্বকে দর্শন কর এবং অন্য যে কিছু দেখিতে চাও তাহাও এক্ষণে দর্শন কর | ৭ ||
ন তু মাং শক্যসে দুষ্টুমনেনৈব স্বচক্ষুষা।
দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ পশ্য মে যােগমৈশ্বরম্ ৷৷ ৮ ৷৷
অনুবাদ—কিন্তু তুমি এই চক্ষুর দ্বারা আমাকে দর্শন করিতে সমর্থ হইবে না , অতএব তােমাকে দিব্য চক্ষু প্রদান করিতেছি, তুমি আমার ঐশ্বরিক-শক্তি দর্শন কর || ৮ ||
সঞ্জয় উবাচ
এবমুক্ত। তততা রাজন্ মহাযােগেশ্বনাে হরিঃ।
দর্শয়ামাস পার্থায় পরমং রূপমৈশ্বরম্ ॥৯॥
অনুবাদ—সঞ্জয় কহিলেন,“হে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র! মহাযােগেশ্বর শ্রীহরি এইরূপ বলিয়া অৰ্জ্জুনকে পরম ঐশ্বররূপ দেখাইলেন ॥ ৯ |
অনেকন্তু নয়নমনেকাদ্ভুতদর্শন।
অনেকদিব্যাভরণং দিব্যানেকোদ্যতায়ুধম্ ৷৷ ১০ ||
দিব্যমাল্যাম্বরধরং দিব্যগন্ধানুলেপনম্।
সর্বাশ্চৰ্যময়ং দেবমনন্তং বিশ্বততমুখম্ ॥১১।
অনুবাদ—সেই রূপ বহুবদন ও নেত্রবিশিষ্ট, বহুবিধ আশ্চৰ্য্য দর্শনীয়, বিবিধ দিব্য অলঙ্কারযুক্ত, অনেক দিব্য উদ্যত অস্ত্রধারী, দিব্যমাল্য ও বস্ত্রবিশিষ্ট, দিব্যগন্ধ-দ্বারা অনুলিপ্ত, সর্বপ্রকার আশ্চর্য্যময়, জ্যোতির্ময়, অনন্ত ও সর্বব্যাপী ৷৷১০-১১৷৷
দিবি সূৰ্য্যসহস্রস্য ভবে যুগপদুঙ্খিতা।
যদি ভাঃ সদৃশী সা স্যাঙাসন্তস্য মহাত্মনঃ ॥ ১২৷৷
অনুবাদ—আকাশে যদি যুগপৎ সহস্র সূর্যের প্রভা উদিত হয়, তাহা হইলে কতকপরিমাণে সেই মহাত্মা বিশ্বরূপের প্রভার তুল্য হইতে পারে । ১২।
তত্ৰৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং প্রবিভক্তমনেকধা।
অপশ্যদেবদেবস্য শরীরে পাণ্ডবস্তদা ॥১৩৷৷
অনুবাদ—তখন অর্জুন পরমদেবের সেই বিরাট শরীরে নানাভাবে বিভক্ত নিখিল জগৎকে একদেশস্থিত দর্শন করিয়াছিলেন । ১৩।
ততঃ স বিস্ময়াবিষ্টো হৃষ্টঝােমা ধনঞ্জয়।
প্রণম্য শিরসা দেবং কৃতাঞ্জলিরভাষত। ১৪।
অনুবাদ—তদনন্তর সেই অৰ্জ্জুন বিস্মিত ও রােমাঞ্চিত হইয়া, অবনত মস্তকে প্রণতিপূৰ্ব্বক অঞ্জলিবদ্ধ হস্তে শ্ৰীকৃষ্ণকে বলিতে লাগিলেন। ১৪৷৷
অৰ্জ্জুন উবাচ
পশ্যামি দেবাংশু দেব দেহে সর্বাংস্তথা ভূতবিশেষসঙঘা।
ব্ৰহ্মাণমীশং কমলাসনস্থমৃষীংশ্চ সর্বানুরগাংশ্চ দিব্যা।১৫৷৷
অনুবাদ—অর্জন কহিলেন—হে দেব ! তােমার দেহে সকল দেবতা, বিবিধ জীবসমূহ, কমলাসনস্থ ব্রহ্মা, সমস্ত দিব্য ঋষিগণ এবং সর্পগণকে দেখিতেছি। ১৫ |
অনেকবাহুদরবনেত্রং পশ্যামি ত্বাং সর্বতােইনন্তরূপ।
নান্তং ন মধ্যং ন পুনস্তবাদিং পশ্যামি বিশ্বেশ্বর বিশ্বরূপ ৷৷ ১৬।
অনুবাদ—হে বিশ্বেশ্বর ! হে বিশ্বরূপ! তােমাতে অসংখ্য বাহু, উদর বদন ও চক্ষুবিশিষ্ট অনন্তরূপ সৰ্ব্বত্রই দেখিতেছি, পুনরায় তােমার আদি, মধ্য ও অন্ত কিছুই দেখিতে পাই না | ১৬ |
কিরীটিনং গদিনং চক্রিণঞ্চ তেজোরাশিং সর্বতে দীপ্তিমন্ত।
পশ্যামি ত্বাং দুর্নিরীক্ষং সমাদ্দীপ্তানলার্কতিমপ্রমেয়ম্ ॥১৭৷৷
অনুবাদ—আমি কিরীট-শশাভিত, গদা ও চক্রধারী রূপ, সম্যক্ দীপ্তিশালী তেজঃপুঞ্জ স্বরূপ এবং দুর্দর্শনীয় ও অপ্রমেয়, প্রদীপ্ত অগ্নি ও সূৰ্যতুল্য প্রভাব-বিশিষ্ট এবং অপ্রমেয় আমি সর্বত্রই দেখিতে পাচ্ছি ॥১৭৷৷
ত্বমক্ষরং পরমং বেদিতব্যং ত্বমস্ত বিশ্বস্ত পরং নিধান।
ত্বমব্যয়ঃ শাশ্বতধৰ্ম্মগােপ্তা সনাতনভৃং পুরুষাে মতাে মে॥১৮ |
অনুবাদ—তুমি মুক্তগণের জ্ঞাতব্য পরম অক্ষরতত্ত্ব, তুমি এই বিশ্বের পরম নিধান, তুমি অব্যয়, তুমি সনাতন ধৰ্ম্ম-রক্ষক, তুমি সনাতন পুরুষ বলিয়া আমার অভিমত ॥ '১৮ |
অনাদি-মধ্যান্তমনন্তৰীৰ্যমনন্তবাহুং শশিসূৰ্য্যনেত্রম্।
পশ্যামি ত্বাং দীপ্তহুতাশৰং স্বতেজসা বিশ্বমিদং তপন্তম্ ॥১৯৷৷
অনুবাদ—আমি তােমাকে উৎপত্তি-স্থিতি-লয় রহিত, অনন্তবীৰ্য্যশালী, অনন্ত বাহুযুক্ত, চন্দ্র সূৰ্য্যরূপ নেত্রবিশিষ্ট, প্রদীপ্ত অনল সদৃশ মুখগহ্বরযুক্ত, নিজ তেজ-দ্বারা এই বিশ্বকে সন্তাপকারীরূপে দর্শন করিতেছি ॥ ১৯ ||
দ্যাপৃথিবব্যারিদমন্তরং হি ব্যাপ্তং ত্বয়ৈকেন দিশ সর্বাঃ।
দৃষ্টাদ্ভুতং রূপমিদং তবােগ্রং লােকয়ং প্রব্যথিতং মহাত্মন্ ॥২০৷৷
অনুবাদ—তুমি একাই স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যে অবস্থিত অন্তরীক্ষকে এবং দিকসমূহকে ব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছ, হে মহাত্মন্ ! তােমার এই অদ্ভুত উগ্রমূর্তি দর্শন করিয়া, লেকত্রয় অত্যন্ত ভীত ও ব্যথিত হইয়াছে ॥ ২০ |
অমী হি ত্বাং সুরসঙঘ বিশন্তি কেচিল্পীঃ প্রাঞ্জলয়াে গৃণন্তি।
স্বস্তীত্যুক্ত। মহর্ষিসিদ্ধসঙঘ বীক্ষন্তে ত্বাং স্তুতিভিঃ পুষ্কলাভিঃ ॥২১৷৷
অনুবাদ—এই সকল দেৰসঘ তােমাতেই প্রবেশরূপ শরণ লইতেছেন, কেহ কেহ ভয়-প্রযুক্ত কৃতাঞ্জলি হইয়া স্তবমুখে প্রার্থনা করিতেছেন, মহর্ষিগণ ও সিদ্ধগণ স্বস্তিবাক্য উচ্চারণ পূৰ্ব্বক উত্তম স্তুতি-সহযােগে তােমাকে দর্শন করিতেছেন। ২১।
রুদ্রাদিত্য বসবাে যে চ সাধ্যা বিশ্বেইশ্বিনৌ মরুশ্চোত্মপাশ্চ।
গন্ধর্ব্যক্ষাসুরসিদ্ধসঙ্ঘা বীক্ষন্তে ত্বাং বিস্মিতাশ্চৈব সর্বে।২২৷৷
অনুবাদ-রুদ্র ও আদিত্যকল, অষ্টবসু ও সাধ্য-দেবগণ, বিশ্বদেবগণ, অশ্বিনীকুমার-দ্বয়, মরুৎ-সকল, উষ্মপ প্রভৃতি পিতৃবর্গ, গন্ধৰ্ব্ব, যক্ষ, অসুর ও সিদ্ধগণ সকলেই বিস্মিত হইয়া তােমাকে দর্শন করিতেছেন ॥২২||
রূপং মহত্তে বহুবক্ত নেত্রং মহাবাহাে বহুবাহুরুপাদ।
বহুদরং বহুদংষ্ট্ৰাকরালং দৃষ্ট। লােকাঃ প্ৰব্যথিতাস্তথাহম্ ৷৷ ২৩ ৷৷
অনুবাদ—হে মহাবাহহ! বহু বদন ও নয়ন যুক্ত, অসংখ্য বাহু-উরু ও পদ-বিশিষ্ট, বহু উদরযুক্ত, অনেক দন্তহেতু ভীষণ দর্শন, তােমার মহং-রূপ দেখিয়া লােকসকল তথা আমি অত্যন্ত ভীত হইতেছি । ২৩
নঃস্পৃশং দীপ্তমনেকবর্ণং ব্যাক্তাননং দীপ্তবিশালনেত্রম্ ।
দৃষ্ট। হি ত্বাং ব্যথিতান্তরাত্মা ধৃতিং ন বিন্দামি শমঞ্চ বিষ্ণো ॥ ২৪৷৷
অনুবাদ—হে বিষ্ণো ! আকাশস্পর্শী, তেজোময়, বিবিধবর্ণযুক্ত, বিস্তৃতমুখ, প্রজ্জলিত বিশাল নেত্র-বিশিষ্ট, তােমাকে দর্শন করিয়া অতিশয় ভীত আমি, ধৈৰ্য্য ও শান্তি লাভ করিতেছি না। ২৪ |
দংষ্ট্রাকরালানি চ তে মুখানি দৃষ্টব কালানলসষ্মিভানি।
দিশাে ন জানে ন লভে চ শৰ্ম প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস ২৫।
অনুবাদ—তােমার দন্তসমূহের দ্বারা বিকট দর্শন, কালানল তুল্য অগ্নি-সদৃশ মুখ সকল দর্শন করিয়াই, আমি দিগ, বিভ্রমে পড়িয়াছি এবং সুখ পাইতেছি না, হে দেবেশ ! হে জগন্নিবাস ! তুমি প্রসন্ন হও | ২৫ |
অমী চ ত্বাং ধৃতরাষ্ট্রস্য পুত্রাঃ সর্বে সহৈবাবনিপালসঘৈঃ ।
ভীষ্মো দ্রোণঃ সূতপুত্রস্তথাসৌ সহাম্মদীয়ৈরপি যােধমুখ্যৈঃ || ২৬।
বানি তে ত্বরমাণ বিশন্তি দংষ্টাকরালানি ভয়ানকানি।
কেচিদ্বিগ্না দশনান্তরেষু সংদৃশ্যন্তে চূর্ণিতৈরুত্তমাঙ্গৈঃ ॥ ২৭।
অনুবাদ—ঐ ধৃতরাষ্ট্র পুত্রেরা সকলে সমস্ত রাজগণকে সঙ্গে করিয়াই, তথা ভীষ্ম, দ্রোণ ও কর্ণ এবং আমাদের পক্ষীয় প্রধান যােদ্ধগণকে লইয়াই, তােমার দিকে ত্বরান্বিত হইয়া তােমার করালদন্তবিশিষ্ট, ভয়ানক মুখগহর মধ্যে প্রবেশ করিতেছে ; কেহ কেহ চুৰ্ণিতমস্তক হইয়া তােমার দন্ত-সন্ধির মধ্যে সংলগ্ন রূপে দৃষ্ট হইতেছে। ২৬-২৭ |
যথা নদীনাং বহবােইবেগঃ সমুদ্রমেবাভিমুখা দ্রবন্তি।
তথা তবামী নরলােকবীরা বিশন্তি বক্তাণ্যভিত জ্বলন্তি ॥২৮৷
অনুবাদ—যেরূপ নদীগণের জলবেগসমূহ সমুদ্রাভিমুখী হইয়া সমুদ্রেই প্রবেশ করে, সেইরূপ এই নবীর সকল তােমার মুখসমূহের মধ্যে প্রবেশ করিতেছে ও সৰ্ব্বতােভাবে জ্বলিত হইতেছে ॥ ২৮ ।
যথা প্রদীপ্তং জ্বলনং পতঙ্গা বিশন্তি নাশায় সমৃদ্ধৰেগাঃ।
তথৈব নাশায় বিশন্তি লােকাস্তবাপি বাণি সমৃদ্ধবেগঃ ॥২৯৷৷
অনুবাদ—যেরূপ পতঙ্গ সকল সমৃদ্ধবেগযুক্ত হইয়া মরণের নিমিত্ত প্রদীপ্ত অগ্নিতে প্রবেশ করে, সেইরূপ এই লােকসকলও অত্যন্ত বেগবান্ হইয়া মরণের নিমিত্তই তােমার মুখগহ্বরে প্রবেশ করিতেছে । ২৯।
লেলিহসে গ্রসমানঃ সমাল্লোকান্ সমগ্রা বদনৈর্জলদ্ভিঃ ।
তেজোভিরাপূৰ্য জগৎ সমগ্ৰং ভাসস্তবাগ্রাঃ প্রতপন্তি বিষ্ণো ॥৩০||
অনুবাদ—হে বিষ্ণো ! তুমি প্রজ্জ্বলিত মুখ-দ্বারা এই সমস্ত লােককে গ্রাস করিতে করিতে চারিদিকে পুনঃ পুনঃ অবলেহন করিতেছ অর্থাৎ আস্বাদ করিতেছ, তােমার তীব্র জ্যোতিঃ সকল তেজের দ্বারা সমগ্র জগৎকে আপূর্বিত করিয়া সন্তপ্ত করিতেছে ॥ ৩০ |
আখ্যাহি মে কো ভবানুরূপাে নমােহস্তু তে দেববর প্রসীদ।
বিজ্ঞতুমিচ্ছামি ভবন্তং ন হি প্রজানামি তব প্রবৃত্তিম্ ॥ ৩১।
অনুবাদ—উগ্ররূপধারী তুমি কে ? তাহা আমাকে বল, তােমাকে প্রণাম করিতেছি ; হে দেববর! প্রসন্ন হও, আদিকারণ তােমাকে বিশেষরূপে জানিতে ইচ্ছা করি, যেহেতু তােমার প্রবৃত্তিকে অর্থাৎ চেষ্টাকে জানিতে পারিতেছি না ॥ ৩১ |
শ্রীভগবানুবাচ,-
কালোহস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধো
লােকান্ সমাহৰ্ত্ত মিহ প্রবৃত্ত।
ঋহেপি তাং ন ভবিষ্যন্তি সর্বে
যেংবস্থিতাঃ প্রত্যনীকেষু যােধাঃ ॥ ৩২।
অনুবাদ—প্ৰশ্রী ভগবান কহিলেন,—আমি লোকক্ষয়কারী অত্যুৎকট কাল, এই সকল লােককে সংহার করিবার নিমিত্ত এক্ষণে প্রবৃত্ত হইয়াছি, প্রতিপক্ষীয় গণের মধ্যে যে সমস্ত যোদ্ধা অবস্থিত আছে, তাহারা সকলেই তুমি ব্যতীতও অর্থাৎ তুমি যুদ্ধে না মারিলেও, কালগ্রস্ত হইয়া মরিবে । ৩২ |
তন্মাত্ত্বমুত্তিষ্ঠ যশশা লন্ঠস্ব জিত্। শক্র ভুঙক্ষ, রাজ্যং সমৃদ্ধ।
ময়ৈবৈতে নিহঃ পূর্বমেব নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচি। ৩৩।
অনুবাদ—অতএব তুমি যুদ্ধের জন্য দণ্ডায়মান হও, শত্ৰুদিগকে জয় করিয়া যশ লাভ কর ও সমৃদ্ধ রাজ্য ভােগ কর, আমাকর্তৃক পূৰ্ব্ব হইতেই ইহার নিহত হইয়া রহিয়াছে ; হে সব্যসাচিন্! তুমি কেবল নিমিত্ত মাত্র হও ॥ ৩৩।
দ্রোণঞ্চ ভীষ্মঞ্চ জয়দ্রথঞ্চ কর্ণং তথান্যানপি যােধবীরা।
ময়া হতাংস্তুং জহি মা ব্যথিষ্ঠা যুধ্যস্ব জেসি রণে সপত্নান্ ॥ ৩৪।
অনুবাদ—আমাকর্তৃক পূর্বেই বিনাশ প্রাপ্ত দ্রোণ, ভীষ্ম, জয়দ্ৰথ, কর্ণ, তথা অন্যান্য যােদ্ধ বীরগণকেও তুমি (পুনরায় ) বধ কর, ব্যথিত হইও না, যুদ্ধে শত্রুগণকে জয় করিতে পারিবে, অতএব যুদ্ধ কর। ৩৪ |
সঞ্জয় উবাচ
এতৎ শ্রুত্বা বচনং কেশবস্য কৃতাঞ্জলির্বের্ধমানঃ কিরীটী।
নমস্কৃত্বা ভূয় এবাহ কৃষ্ণং গদগঙ্গং ভীতভীতঃ প্রণম্য ॥ ৩৫।
অনুবাদ—সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে কহিলেন,—কেশবের এই সকল বাক্য শ্রবণ করিয়া অৰ্জন কম্পিত কলেবরে কৃতাঞ্জলি-সহকারে নমস্কার করিয়া, অত্যন্ত ভীত হইয়া পুনৰ্বার প্রণাম পূৰ্ব্বক, গদ্গদ-বাক্যে শ্রীকৃষ্ণকে কহিতে লাগিলেন ॥৩৫||
অর্জুন উবাচ
জানে হৃষীকেশ ভব প্রকীৰ্ত্তা
জগৎ প্রত্যন্তরজ্যতে চ।
রক্ষাংগি ভীনি দিশাে দ্রবন্তি
সর্বেব নমস্যক্তি চ সিদ্ধসঙঘঃ ॥ ৩৬।
অনুবাদ—অৰ্জন কহিলেন,“হে হৃষীকেশ ! তােমার যশঃ-কীৰ্ত্তন-শ্রবণে জগৎ অত্যন্ত আনন্দ লাভ করে এবং তােমাতে অনুরক্ত হয়, রাক্ষসগণ ভীত হইয়া চতুর্দিকে পলায়ন করে এবং সিদ্ধপুরুষগণ সকলে নমস্কার করে, এই সমস্তই তাহাদের পক্ষে যুক্তিযুক্ত ॥ ৩৬ |
কস্মাচ্চ তে ন নমন্মহাত্ম গরীয়সে ব্রহ্মগােহপ্যাদিকত্রে।
অনন্ত দেবেশ জগম্নিবাস ত্বমক্ষরং সদসত্তৎপরং যৎ ॥ ৩৭।
অনুবাদ—হে মহাত্মন্ ! হে অনন্ত ! হে দেবেশ ! হে জগন্নিবাস! তুমি ব্রহ্মা হইতেও গুরুতর তত্ত্ব, আদি সৃষ্টিকর্তা, তুমিই সৎ ও অসৎ উভয়ের অতীত অক্ষরতত্ত্ব ব্ৰহ্ম ; তাহারা কেনই বা তােমাকে নমস্কার করিবেন না ? ॥৩৭||
ত্বমাদিদেবঃ পুরুষঃ পুরাণমন্ত বিশ্বস্ত পরং নিধান।
বেত্তাসি বেঞ্চ পরঞ্চ ধাম ত্বয়া তং বিশ্বমনন্তরূপ। ৩৮ |
অনুবাদ—তুমি আদিদেব ও সনাতন পুরুষ, তুমি এই বিশ্বের লয়স্থান, তুমি বেত্তা ও বেদ্য এবং গুণাতীত পরমধাম স্বরূপ ; হে অনন্তরূপ ! এই বিশ্ব তোমার দ্বারা ব্যাপ্ত রহিয়াছে। ৩৮ |
বায়ুৰ্যমােহগ্নিৰ্বরুণঃ শশাঙ্কঃ প্রজাপতিত্বং প্রপিতামহ।
নমাে নমস্তেহস্তু সহস্ৰকৃত্বঃ পুনশ্চ ভুয়ােহপি নমাে নমস্তে ৷৷ ৩১৷৷
অনুবাদ—তুমি বায়ু, যম, অগ্নি, বরুণ, চন্দ্র, প্রজাপতি এবং ব্রহ্মারও পিতা অতএব তােমাকে নমস্কার, সহস্রবার নমস্কার, পুনরায় নমস্কার, পুনৰ্ব্বারও নমস্কার ৩৯ |
নমঃ পুরস্তাদথ পৃষ্ঠতন্তে নমােহন্তু তে সর্বত এব সৰ্ব্ব।
অনন্তৰীৰ্য্যামিবিক্রমন্তং সর্বং সমাপ্লাষি তােহসি সর্বঃ ॥ ৪০
অনুবাদ—হে সৰ্ব্বস্বরূপ ! তােমার সম্মুখে, অনন্তর পশ্চাতে এবং সৰ্ব্বদিকে নমস্কার, অনন্তবীৰ্য্য ও পরাক্রমশালী তুমি, সমগ্র বিশ্বকে ব্যাপিয়া আছ, অতএব তুমিই সৰ্ব্ব ॥ ৪০ |
সখেতি মত্ব প্রসভং যদুক্তং হে কৃষ্ণ হে যাদব হে সথেতি।
অজান মহিমানং তবেদং ময়া প্রমাদাৎ প্রণয়েন বাপি ৪১
যাবহাসার্থমসৎকৃতােহসি বিহারশয্যাসনভােজনেষু।
একোহথবাহপ্যচ্যুত তৎসমক্ষং তৎ ক্ষাময়ে স্বামহমপ্রমেয় ৷৷ ৪২ |
অনুবাদ—তােমার এই বিশ্বরূপ সম্বন্ধীয় মহিমা অবগত না হইয়া প্রমাদ-বশতঃ অথবা প্রণয়বশতঃ, তােমাকে সখা মনে করিয়া, হে কৃষ্ণ! হে যাদব। হে সখে ! ইত্যাদি সােধন, সামাজিক অভিমান সহকারে করিয়াছি ; হে অচ্যুত! বিহার, শয়ন, উপবেশন ও ভােজনাদি-সময়ে একাকী স্থিতি কালে অথবা বন্ধুজনের সমক্ষে, পরিহাস পূৰ্ব্বক যে অসৎকার করিয়াছি, সেই সমস্ত অপরাধের জন্য অপ্রমেয় বিরাট পুরুষ তােমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি ॥ ৪১-৪২।
পিতাস লােকস্য চরাচরস্য
ত্বমস্ত পূজ্যশ্চ গুরুর্গরীয়ান্।
ন ত্বৎসমােহস্ত্যভ্যধিকঃ কুতােহদ্যো
লােকত্রয়েইপ্যপ্রতিমপ্রভাব। ৪৩ ৷৷
অনুবাদ—হে অপ্রমেয় প্রভাবশালি। তুমি এই চরাচর বিশ্বের পিতা, পূজ্য, গুরু ও গুরুশ্রেষ্ঠ, ত্রিলােকে তােমার সমান কেহই নাই, অধিক আর কোথা হইতে হইবে ? | ৪৩ |
তৎ প্রণম্য প্রণিধায় কায়ং প্রসাদয়ে ত্বমহমীশমীড্যম্।
পিতেব পুত্রস্য সখেব সখ প্রিয়ঃ প্রিয়ায়াহসি দেব সােঢ়ম৷৷ ৪৪ |
অনুবাদ—অতএব আমি দেহকে ভূতলে দণ্ডবৎ নিপতিত করিয়া, প্রণতি পূৰ্ব্বক স্তবনীয় ঈশ্বর তােমার নিকট প্রসন্নতা যাঙ্ক্ষা করিতেছি ; হে দেব ! পুত্রের পিতা যেরূপ, সখার সখা যেরূপ, প্রিয়ার প্রিয় যেরূপ অপরাধ ক্ষমা করেন তুমিও সেরূপ আমার অপরাধ ক্ষমা করতে সমর্থ ॥৪৪॥
অদৃষ্টপূর্বং হৃষিতােহস্মি দৃষ্ট। ভয়েন চ প্ৰব্যথিতং মনাে মে।
তদেব মে দর্শয় দেবরূপং প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস ॥ ৪৫।
অনুবাদ—হে দেব! তােমার পূর্বে দেখা যায় নাই এমন এই রূপ দেখিয়া আমি হৃষ্ট হইয়াছি, কিন্তু আমার মন অত্যন্ত ব্যথিতও হইয়াছে ; হে দেবেশ ! তােমার সেই রূপ আমাকে দর্শন করাও ; হে জগন্নিবাস ! তুমি প্রসন্ন হও ॥৪৫॥
কিরীটিনং গদিনং চক্ৰহস্তমিচ্ছামি ত্বাং দ্রষ্টমহং তথৈব
তেনৈব রূপেণ চতুভুজেন সহস্রবাহাে ভব বিশ্বমুর্তে। ৪৬ |
অনুবাদ—আমি তােমাকে সেইরূপেই কিরীটধারী, গদাধারী, চক্রধারী দেখিতে ইচ্ছা করি ; হে সহস্রবাহহ! হে বিশ্বমূর্তে ! তুমি সেই পূৰ্ব্বদৃষ্ট চতুভুজ-রূপ-বিশিষ্টই হও॥৪৬॥
ভগবানুবাচ
ময়া প্রসন্নেন তবাৰ্জ্জুনেদং রূপং পরং দর্শিতমাত্মযােগৎ।
তেজোময়ং বিশ্বমনন্তমাং যন্মে ত্বদনে ন দৃষ্টপূর্ব ৷৷ ৪৭।
অনুবাদ—শ্রীভগবান্ কহিলেন,—হে অর্জুন! আমি প্রসন্ন হইয়া তােমাকে নিজ-যােগমায়াবলপ্রভাবে আমার তেজোময়, বিশ্বরূপী, অনন্ত ও আদ্য এই শ্রেষ্ঠ বিশ্বরূপ দেখাইলাম, তােমাব্যতীত পূৰ্বে আর কেহ এই রূপ দেখে নাই ॥৪৭॥
ন বেদজ্ঞাধ্যয়নৈর্ন দানৈর্ন চ ক্রিয়াভি পােভিরুগ্রৈঃ।
এবংরূপঃ শক্য অহং নৃলােকে দ্রষ্টং বৃদনে কুরুপ্রবীর৷৷ ৪৮।
অনুবাদ—হে কুরুপ্রবীর ! বেদাধ্যয়ন, যজ্ঞ, দান, ক্রিয়া ও উগ্র-তপস্যার দ্বারা ইহলােকে তুমি ভিন্ন অপর কেহ এই বিশ্বরূপী আমাকে দর্শন করিতে সমর্থ নহে। ৪৮ ||
মা তে ব্যথা মা চ বিমুঢ়ভাবে দৃষ্ট। রূপং যােরমীদৃঙ মমেদ।
ব্যপেতভীঃ প্রীতমনাঃ পুনত্বং তদেব মে রূপমিদং প্রপশ্য ॥ ৪৯।
অনুবাদ—আমার এতাদৃশ ভীষণ-রূপ দর্শন করিয়া তােমার যেন ব্যথা বা বিমূঢ় ভাব না হয়, তুমি নির্ভয় ও প্রীতমনা হইয়া আমার এই সেই চতুভুজ রূপ পুনরায় প্রকৃষ্টরূপে দর্শন কর ॥৪৯॥
সঞ্জয় উবাচ
ইত্যৰ্জ্জুনং বাসুদেবস্তখােক্ত স্বকং রূপং দর্শয়ামাস ভুয়ঃ।
আশ্বাসয়ামাস চ ভীতমেনং ভূত্বা পুনঃ সৌম্যবপুৰ্মহাত্মা॥ ৫০ ।
অনুবাদ—সঞ্জয় কহিলেন,—পরম কারুণিক বাসুদেব অর্জনকে এইরূপ বলিয়া পুনরায় স্বীয় চতুভুজমূর্তি দর্শন করাইলেন এবং সৌম্যমূর্তি অর্থাৎ দ্বিভুজ হইয়া ভীতমনা অর্জুনকে পুনৰ্ব্বার আশ্বাস প্রদান করিলেন ॥ ৫০ |
অর্জুন উবাচ
দৃষ্টেদং মানুষং রূপং তব সৌম্যং জনার্দন।
ইদানীমম্মি সংবৃত্তঃ সচেতাঃ প্রকৃতিং গতঃ ॥ ৫১।
অনুবাদ—অৰ্জন কহিলেন,—হে জনার্দন! তােমার এই সৌম্য মানুষরূপ দর্শন করিয়া আমার চিত্ত স্থির হইল এবং পুনরায় স্বপ্রকৃতিস্থ হইলাম ॥ ৫১।
শ্রীভগবানুবাচ
সুদুর্দর্শমিদং রূপং দৃষ্টবানসি যম।
দেবা অপ্যশ্য রূপস্য নিত্যং দর্শনকাঙিক্ষণঃ ॥ ৫২।
অনুবাদ—শ্রীভগবান্ কহিলেন,—আমার এই অত্যন্ত দুর্লভ-দর্শন যে রূপ তুমি দশন করিলে, দেবতারাও এই রূপের সর্বদা দর্শন আকাঙ্খী ॥ ৫২
নাহং বেদৈন তপসা ন দানেন ন চেজয়া।
শক্য এবংবিধাে দ্রঃং দৃষ্টবানসি যম। ৫৩।
অনুবাদ—তুমি আমাকে যেরূপ দর্শন করিলে, সেইপ্রকার রূপবিশিষ্ট আমাকে বেদাধ্যয়ন, তপস্যা, দান ও যজ্ঞের দ্বারা দর্শন করিতে কেহ সমর্থ হয় না ॥ ৫৩।
ভক্ত্যা নয়া শক্যো অহমেবংবিধােৰ্জ্জুন।
জ্ঞাতুং দুষ্টুঞ্চ তন্ত্রেন প্রবেঞ্চ পরন্তপ । ৫৪ |
অনুবাদ—হে পরন্তপ অর্জুন! অনন্যভক্তির দ্বারাই কিন্তু, এই রূপ-বিশিষ্ট আমাকে তত্ত্বতঃ জানিতে, দর্শন করিতে ও আশ্রয় করিতে সমর্থ । ৫৪।
মৎকৰ্ম্মকৃৎপরমাে মক্তঃ সঙ্গবর্জিতঃ।
নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু যঃ স মামেতি পাণ্ডব। ৫৫।
অনুবাদ—হে পাণ্ডব ! যিনি আমারই সেবা করেন, আমাকেই পরম বলিয়া জানেন, আমার ভক্ত, সর্বত্র আসক্তি শূন্য ও সৰ্ব্বভূতে দ্বেষ-রহিত, তিনিই আমাকে প্রাপ্ত হন। ৫৫ ৷৷
0 comments:
Post a Comment