হাতের ভাষা
কররেখা বা হাতের ভাষা পাঠ করিবার পূর্বে, হাতের বিষয় সম্যক রূপে অবগত হওয়া বিশেষ আবশ্যক। কেননা, হাতের গঠনের তারতম্য অনুসারে মানব-প্রকৃতির পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন মানবদেহেসাত প্রকার বিভিন্ন আকৃতি ও গঠনের কর দৃষ্ট হয়। যথা :-
১। চতুষ্কোণ হস্ত
২। দার্শনিক
৩। সূচ্যগ্র
৪। শিল্পী
৫। মিশ্রিত
৬। স্থূলাগ্র
৭। অপরিপুষ্ট
নিচে তার বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে
(১) চতুষ্কোণ হস্ত
হস্তাঙ্গুলির নখসংযুক্ত পর্বগুলি অনেকাংশে চতুষ্কোণ বলিয়া ইহাবে চতুষ্কোণ হস্ত বলা হয়। চতুষ্কোণ হস্তবিশিষ্ট জাতক অধ্যবসায়ী, সুবুদ্ধি রাজনীতিক, কর্তব্যজ্ঞানসম্পন্ন, গম্ভীর, নিয়ম ও শৃঙ্খলার বশবর্তী,
স্নেহপ্রবণ, বিদ্যাপ্রিয়, অকপট, বিশ্বাস ও ভক্তিভাজন, সদালাপী, শিষ্টাচারী, অনুসন্ধিৎসু, কৰ্ম্ম ও ক্রিয়াকুশল হইয়া থাকে। কল্পনাপ্রবণ লােকের সহিত ইহাদের মতের ঐক্য হয় না। ইহারা নিৰ্বিবাদী, শান্তিপ্রিয়, কিন্তু ভীরু নহে। সত্যনির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠাকল্পে তর্ক বা কলহাদিতে প্রায়ই অপরাজেয় হইয়া থাকে। শিক্ষিত, বণিক, আইনব্যবসায়ী, হিসাবনবিশ, গ্রন্থাধ্যক্ষ, মসীজীবী, দালাল, নট, লেখক, উদ্ভিদবিদ্যাবি ও বিচারকগণের হস্তের গঠন প্রায়শ: এইরূপ ধরণের হইয়া থাকে।
(২) দার্শনিক হস্ত
এইরূপ হস্তবিশিষ্ট জাতক চিন্তাশীল, বিবেকী, তত্ত্বজ্ঞানী, দর্শন ও নীতিশাস্ত্রে অভিজ্ঞ, বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসক, রাসায়নিক, গবেষণাপ্রিয়, কর্তব্যপরায়ণ, সত্যান্বেষী, অহিংস, অক্ৰোধী, বিশ্বাসপরায়ণ, জ্ঞানপিপাসু, সঙ্গোপনশীল, যােগী, ভক্তিমান্, নেতৃত্বগুণসম্পন্ন ও (স্বেচ্ছাচারী হইলেও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিচার করিয়া) কাৰ্য্যকুশল হইয়া থাকে। বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসক, রাসায়নিক ও শিক্ষকগণের মধ্যে সচরাচর এইরূপ হস্ত দৃষ্ট হয়।
(৩) সূচ্যগ্র হস্ত
সূচ্যগ্র হস্ত নিম্নলিখিত গুণাবলীর পরিচায়ক। দিব্যজ্ঞানসম্পন্ন, ভাবপ্রবণ, আপন ভাবে বিড়াের, সৌন্দৰ্য্যপ্রিয়, প্রেমিক, বেশ-ভূষায় পরিপাটী, পরহিতাকাঙ্ক্ষী, সহজবুদ্ধিবিশিষ্ট, কাল্পনিক, কবি, সঙ্গীতপ্রিয়, স্থির-ধীর, উদার, প্রেমিক, করুণহৃদয়, প্রত্যুৎপন্নমতি, শান্তিপ্রিয়, সৰ্ববিষয়ে উচ্চাদর্শ, সকল লােকের প্রতি উচ্চ ধারণা-পােষণকারী। ইহাদের মানসিক দুর্বলতা হেতু কার্যপ্রণালী অসংবদ্ধ ও ব্যবসাবুদ্ধি অপ্রখর, এবং ইহাদের মন তুচ্ছ বিষয়ে আকৃষ্ট হয় না।
(৪) শিল্পী হস্ত
ইন্দ্রিয়-সুখপরায়ণ, সৌন্দৰ্য্যপ্রিয়, আত্মসুখী, ধারণপ্রবণ, গুণবান্, সদানন্দ, অধীর, অলস, উত্তেজনাশীল, দেশভ্রমণপ্রিয়, পরিবর্তনকামী, আবেগময়, ভাবপ্রবণ, পরমত-অসহিষ্ণু, নই, বক্তা, কল্পনাপ্রিয়, কল্পনানুযায়ী কাৰ্য্য করিতে স্বয়ং অক্ষম, কিন্তু অন্যের দ্বারা করাইয়া লইতে পটু, সুখ-দুঃখে অকিঞ্চিৎকর জ্ঞান, যেমন তনুরাগ তেমনি বিরাগ ইত্যাদি লক্ষণ শিল্পী হস্ত দ্বারা সূচিত হয়।
(৫) মিশ্রিত হস্ত
বিভিন্ন প্রকার অগ্রভাগবিশিষ্ট অঙ্গুলি থাকায় এরূপ হস্তকে মিশ্রিত হস্ত বলা হয়। এইরূপ লক্ষণাক্রান্ত হইলে, জাতক বহু বিষয়ের সন্ধান রাখে, সর্বাবস্থায়, সর্ব বিষয়ে সামঞ্জস্য রাখিয়া কাৰ্য্য করিতে পটু, আরব্ধ কাৰ্য্য অনেক স্থলে সমাপ্ত করিতে অসমর্থ কিন্তু প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও সমধিক ধৈৰ্য্য থাকিলে সাফল্য ও খ্যাতিলাভ সুনিশ্চিত। ভাল হইবেই-বৃষ্টির পর রৌদ্র, দুঃখের পর সুখ ইত্যাদি প্রকার ধারণা বদ্ধমূল। অর্থ অপেক্ষা যশঃপ্রিয়, সদালাপী, মুগ্ধকারী ও জনপ্রিয়। রাজকাৰ্য, কৃষি ও শিল্পকৰ্ম্ম, ব্যবসায়, ধৰ্ম্মাদি সকল বিষয় জানে কিন্তু কোনটিতে বিশেষ পারদর্শী নহে। পরিবর্তনীয় মনােবৃত্তি, দেবােপাসক কিন্তু ধাৰ্মিক নহে; বিচক্ষণ, প্রতিভাশালী, মেধাবী, মৌলিক, সঠিকভাবে বুঝাইতে পটু।
(৬) ছুলাগ্র হস্ত
এই চিত্রানুরূপ অঙ্গুলিসংলগ্ন, দৃঢ় ও কঠিন করতল, অব্যবস্থিত ও চঞ্চলচিত্তের পরিচায়ক। জাতক সহজে উত্তেজিত হয়, আত্মনির্ভর, স্বাধীনচেতা, স্বাবলম্বী, দৃঢ়সঙ্কল্প, উদ্ভাবন-শক্তিসম্পন্ন, শারীরিক ও
মানসিক উভয়বিধ কাৰ্য্যে পটু, কাৰ্য্যতৎপর, গীত-বাদ্যে পারদর্শী, চতুর, বিচক্ষণ, পরিশ্রমী, ব্যায়ামী, কল-কারখানা ও বাণিজ্যে বিশেষজ্ঞ অধ্যবসায়ী, স্বনামধন্য, অকপট, বন্ধুবৎসল, সত্যবাদী, প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সচেষ্ট, আদৌ পরমুখাপেক্ষী নহে। কিন্তু এই প্রকার হস্ত যদি কোমল ও শ্লথ হয়, তাহা হইলে জাতক অস্থিরচিত্ত, ক্রোধন, অলস ও অন্যের কাৰ্য্য পৰ্যবেক্ষণে পটু হয়।
(৭) অপরিপুষ্ট হস্ত
কঠোর পরিশ্রমী, বলবা, অল্পবুদ্ধি, অবিবেচক, অল্পবিদ্যাসম্পন্ন বা মুর্থ, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য, পাশবিক প্রবৃত্তিসম্পন্ন, ক্রুদ্ধ হইলে দুর্দমনীয়, অপরিপুষ্ট হস্ত অল্পে তুষ্ট, স্বাবলম্বী, পান, আহার ও আমােদে কষ্টার্জিত অর্থব্যয়কারী। কৃষক, মজুর, কারিকর, শ্রমিক, শ্রমশিল্পী, ভারবাহী, ফেরিওয়ালা, কসাইপ্রভৃতি শ্রেণীর ব্যক্তিদিগের মধ্যে অধিকাংশেরই হস্ত এই প্রকারের হইয়া থাকে। ইহাদের ধারণাশক্তি অতীব অল্প, এমন কি, অনেক ক্ষেত্রে নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।
0 comments:
Post a Comment