শ্লোক: 1:
অর্জুন উবাচ
যে শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ ।
তেষাং নিষ্ঠা তু কা কৃষ্ণ সত্ত্বমাহো রজস্তমঃ ॥১॥
অনুবাদ—অর্জুন বলিলেন, হে কৃষ্ণ ! যাহারা শাস্ত্রবিধি-ত্যাগ পূর্বক শ্রদ্ধাযুক্ত হইয়া যজনাদি করে, তাহাদের নিষ্ঠা বা আশ্রয় কিরূপ ? উহা সাত্ত্বিক অথবা রাজসিক বা তামসিক ॥ ১॥
শ্লোক: 2:
শ্রীভগবানুবাচ
ত্রিবিধা ভবতি শ্রদ্ধা দেহিনাং সা স্বভাবজা ।
স্বাত্ত্বিকী রাজসী চৈব তামসী চেতি তাং শৃণু ॥২॥
অনুবাদ—শ্রীভগবান্ বলিলেন, জীবের শ্রদ্ধা সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক ভেদে তিন প্রকার, তাহা পূৰ্ব জন্মান্তরীয় সংস্কার-জাত , সেই বিষয় শ্রবণ কর ॥ ২॥
শ্লোক: 3:
সত্ত্বানুরূপা সর্বস্য শ্রদ্ধা ভবতি ভারত ।
শ্রদ্ধাময়োহয়ং পুরুষো যো যচ্ছ্রদ্ধঃ স এব সঃ ॥৩॥
অনুবাদ—হে ভারত ! সকলের শ্রদ্ধা স্ব-স্ব অন্তঃকরণ-অনুরূপ হয়, এই পুরুষ শ্রদ্ধাময় অতএব যে ব্যক্তি যাদৃশ পূজ্যবস্তুতে শ্রদ্ধাসম্পন্ন, সেই ব্যক্তি তাদৃশ চিত্তবৃত্তি-বিশিষ্টই হইয়া থাকে ॥ ৩॥
শ্লোক: 4:
যজন্তে সাত্ত্বিকা দেবান্ যক্ষরক্ষাংসি রাজসাঃ ।
প্রেতান্ ভূতগণাংশ্চান্যে যজন্তে তামসা জনাঃ ॥৪॥
অনুবাদ—সাত্ত্বিক প্রকৃতির লােকেরা সত্ত্ব-প্রকৃতি দেবতাদিগকে পূজা করিয়া থাকে, রাজসিক ব্যক্তিগণ রজঃ-প্রকৃতি—যক্ষরাক্ষসদিগকে পূজা করে, অন্য তামসিক জনগণ তমঃ-প্রকৃতিপ্রেত ও ভূতগণকে উপাসনা করে ॥ ৪॥
শ্লোক: 5:6
অশাস্ত্রবিহিতং ঘোরং তপ্যন্তে যে তপো জনাঃ ।
দম্ভাহঙ্কারসংযুক্তাঃ কামরাগবলান্বিতাঃ ॥৫॥
কর্ষয়ন্তঃ শরীরস্থং ভূতগ্রামমচেতসঃ ।
মাং চৈবান্তঃশরীরস্থং তান্ বিদ্ধ্যাসুরনিশ্চয়ান্ ॥৬॥
অনুবাদ—দম্ভ ও অহঙ্কার-সম্পন্ন, কামনা, আসক্তি ও বলবিশিষ্ট যে সকল অবিবেকী লােক শরীরস্থ পঞ্চভূতকে ও অন্তরস্থিত আমাকে ক্লেশ প্রদান পূৰ্ব্বক, অশাস্ত্রীয় ঘােরতর তপস্যা করে, তাহাদিগকে আসুর-নিষ্ঠায় অবস্থিত। বলিয়া জানিবে ॥ ৫-৬ ॥
অনুবাদ—সকল মানবের আহারও তিন প্রকার প্রীতিকর হইয়া থাকে, তদ্রুপ যজ্ঞ, তপস্যা ও দান ত্রিবিধ প্রীতিকর তাহাদের এই ভেদ বলিতেছি, শ্রবণ কর ॥ ৭॥
শ্লোক: 8:
আয়ুঃসত্ত্ববলারোগ্যসুখপ্রীতিবিবর্ধনাঃ ।
রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ ॥৮॥
অনুবাদ—আয়ুঃ, সত্ত্ব, বল, রোগশূন্যতা, সুখ ও প্রীতিবৃদ্ধিকারী, রসযুক্ত, স্নিগ্ধ, স্থায়ী, হৃদয়গ্রাহী, আহার সকল সাত্ত্বিক প্রকৃতিবিশিষ্ট লােকের প্রিয় ॥ ৮ ॥
শ্লোক: 9:
কট্বম্ললবণাত্যুষ্ণতীক্ষ্ণরুক্ষবিদাহিনঃ ।
আহারা রাজসস্যেষ্টা দুঃখশোকাময়প্রদাঃ ॥৯॥
অনুবাদ—অতিশয় কটু, অতিশয় অম্ল , অত্যন্ত লবণ, অতিশয় উষ্ণ, অতি তীক্ষ্ণ, অত্যন্ত রুক্ষ ও অতিশয় বিদাহী, দুঃখ, শােক ও রােগপ্রদ আহার সকল রাজস ব্যক্তিগণের প্রিয় হয়॥ ৯॥
শ্লোক: 10:
যাতযামং গতরসং পূতি পর্যুষিতং চ যৎ ।
উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভোজনং তামসপ্রিয়ম্ ॥১০॥
অনুবাদ—এক প্রহর পূর্বে পক্ক হওয়ার ফলে অতিশয় ঠাণ্ডা, রসহীন, দুর্গন্ধযুক্ত, বাসী, গুরুবর্গব্যতীত অপরের উচ্ছিষ্ট, এবং মদ্যমাংসাদি অমেধ্যদ্রব্য সকলের যে ভােজন, তাহা তামস-প্রকৃতি-লােকের প্রিয় ॥ ১০ ॥
শ্লোক: 11:
অফলাকাঙ্ক্ষিভির্যজ্ঞো বিধিদিষ্টো য ইজ্যতে ।
যষ্টব্যমেবেতি মনঃ সমাধায় স সাত্ত্বিকঃ ॥১১॥
অনুবাদ—ফলাকাঙ্ক্ষারহিত পুরুষ, অবশ্য যজনীয়—এইরূপ বিচারে মনকে নিশ্চয় করিয়া শাস্ত্রোপদিষ্ট যে যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে, তাহা সাত্ত্বিক ॥ ১১ ॥
শ্লোক: 12:
অভিসন্ধায় তু ফলং দম্ভার্থমপি চৈব যৎ ।
ইজ্যতে ভরতশ্রেষ্ঠ তং যজ্ঞং বিদ্ধি রাজসম্ ॥১২॥
অনুবাদ—হে ভরতশ্রেষ্ঠ! কিন্তু ফলাভিপ্রায়পূর্বক এবং দম্ভ প্রকাশের জন্যই যে যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়, সেই যজ্ঞকে রাজসিক বলিয়া জানিবে ॥ ১২॥
শ্লোক: 13:
বিধিহীনমসৃষ্টান্নং মন্ত্রহীনমদক্ষিণম্ ।
শ্রদ্ধাবিরহিতং যজ্ঞং তামসং পরিচক্ষতে ॥১৩॥
শ্লোক: 14:
দেবদ্বিজগুরুপ্রাজ্ঞপূজনং শৌচমার্জবম্ ।
ব্রহ্মচর্যমহিংসা চ শারীরং তপ উচ্যতে ॥১৪॥
অনুবাদ—দেবতা, ব্রাহ্মণ, গুরু ও প্রাজ্ঞগণের পূজা, শৌচ, সরলতা, ব্রহ্মচর্য ও অহিংসা—ইহারা শরীর সম্বন্ধীয় তপস্যা বলিয়া কথিত হয় ॥ ১৪ ॥
শ্লোক: 15:
অনুদ্বেগকরং বাক্যং সত্যং প্রিয়হিতং চ যৎ ।
স্বাধ্যায়াভ্যসনং চৈব বাঙ্ময়ং তপ উচ্যতে ॥১৫॥
শ্লোক: 16:
মনঃপ্রসাদঃ সৌম্যত্বং মৌনমাত্মবিনিগ্রহঃ ।
ভাবসংশুদ্ধিরিত্যেতৎ তপো মানসমুচ্যতে ॥১৬॥
অনুবাদ—চিত্তের প্রসন্নতা, সরলতা, মৌন, মনঃ সংযম ও নিষ্কপট ব্যবহার —এই সকলকে মানসিক তপস্যা বলা হয় ॥ ১৬॥
শ্লোক: 17:
শ্রদ্ধয়া পরয়া তপ্তং তপস্তৎ ত্রিবিধং নরৈঃ ।
অফলাকাঙ্ক্ষিভির্যুক্তৈঃ সাত্ত্বিকং পরিচক্ষতে ॥১৭॥
অনুবাদ—ফলকামনারহিত, একাগ্রচিত্ত পুরুষগণকর্তৃক পরম শ্রদ্ধাসহকারে অনুষ্ঠিত উক্ত ত্রিবিধ তপস্যাকে পণ্ডিতগণ সাত্ত্বিক বলিয়া থাকেন ॥ ১৭ ॥
শ্লোক: 18:
সৎকারমানপূজার্থং তপো দম্ভেন চৈব যৎ ।
ক্রিয়তে তদিহ প্রোক্তং রাজসং চলমধ্রুবম্ ॥১৮॥
অনুবাদ—সৎকার, মান ও পূজা লাভের জন্য দম্ভের সহিত যে তপস্যা অনুষ্ঠিত হয়, তাহাই ইহলােকে অনিত্য ও অনিশ্চিত রাজস তপঃ বলিয়া কথিত হয় ॥ ১৮ ॥
শ্লোক: 19:
মুঢ়গ্রাহেণাত্মনো যৎ পীড়য়া ক্রিয়তে তপঃ ।
পরস্যোৎসাদনার্থং বা তত্তামসমুদাহৃতম্ ॥১৯॥
অনুবাদ—অবিবেক জনিত দুরাগ্ৰহ হেতু নিজের দেহ-মনকে পীড়ন করিয়া অথবা অপরের বিনাশের জন্য যে তপস্যা অনুষ্ঠিত হয়, তাহাকে তামসিক তপস্যা বলে ॥ ১৯॥
শ্লোক: 20:
দাতব্যমিতি যদ্দানং দীয়তেহনুপকারিণে ।
দেশে কালে চ পাত্রে চ তদ্দানং সাত্ত্বিকং স্মৃতম্ ॥২০॥
অনুবাদ—প্রত্যুপকার করিতে অসমর্থ ব্যক্তিকে, তীর্থ স্থানে, শুভকালে, বিদ্যাদি গুণযুক্ত পাত্রকে, দান করা কর্তব্য—এইরূপ নিশ্চয়পূর্বক যে দান করা হয়, সেই দানকে সাত্ত্বিক বলা হয় ॥ ২০॥
শ্লোক: 21:
যত্তু প্রত্যুপকারার্থং ফলমুদ্দিশ্য বা পুনঃ ।
দীয়তে চ পরিক্লিষ্টং তদ্দানং রাজসং স্মৃতম্ ॥২১॥
অনুবাদ—কিন্তু প্রত্যুপকারের আশায় বা স্বর্গাদি লাভের উদ্দেশে পশ্চাত্তাপ সহকারে যাহা প্রদত্ত হয়, সেই দান রাজস বলিয়া কথিত ॥ ২১॥
শ্লোক: 22:
অদেশকালে যদ্দানমপাত্রেভ্যশ্চ দীয়তে ।
অসৎকৃতমবজ্ঞাতং তত্তামসমুদাহৃতম্ ॥২২॥
অনুবাদ—অস্থানে বা অকালে ও অযােগ্য পাত্রে সৎকারহীন ভাবে ও অবজ্ঞার সহিত যে দান, তাহা তামসিক বলিয়া অভিহিত ॥ ২২॥
শ্লোক: 23:24:
ওঁ তৎসদিতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ ।
ব্রাহ্মণাস্তেন বেদাশ্চ যজ্ঞাশ্চ বিহিতাঃ পুরা ॥২৩॥
তস্মাদ্ ওঁ ইত্যুদাহৃত্য যজ্ঞদানতপঃক্রিয়াঃ ।
প্রবর্তন্তে বিধানোক্তাঃ সততং ব্রহ্মবাদিনাম্ ॥২৪॥
অনুবাদ—“ওঁ তৎ সৎ'—এই তিন প্রকার ব্ৰহ্মনির্দেশক নাম শাস্ত্রে কথিত আছে। পুরাকালে সেই নাম-দ্বারা ব্রাহ্মণ, বেদ ও যজ্ঞসমূহ বিহিত হইয়াছে। অতএব ব্রহ্মবাদিগণের শাস্ত্রোক্ত যজ্ঞ, দান, তপঃ ও ক্রিয়াসমূহ সৰ্ব্বদা ব্রহ্মোদ্দেশক ‘ও’ এই শব্দ ব্যবহার পূর্বক অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে ॥ ২৩-২৪॥
শ্লোক: 25:
তদিত্যনভিসন্ধায় ফলং যজ্ঞতপঃক্রিয়াঃ ।
দানক্রিয়াশ্চ বিবিধাঃ ক্রিয়ন্তে মোক্ষকাঙ্ক্ষিভিঃ ॥২৫॥
অনুবাদ—মোক্ষকামিগণ কর্মের ফলাভিসন্ধান না করিয়া তৎ' এই ব্রহ্মোদ্দেশক নাম উচ্চারণপূৰ্ব্বক, বিবিধ যজ্ঞ, তপ ও দানাদি ক্রিয়া অনুষ্ঠান করিয়া থাকেন। ২৫॥
শ্লোক: 26:
সদ্ভাবে সাধুভাবে চ সদিত্যেতৎ প্রযুজ্যতে ।
প্রশস্তে কর্মণি তথা সচ্ছব্দঃ পার্থ যুজ্যতে ॥২৬॥
অনুবাদ—হে পার্থ ! সদ্ভাবে ও সাধুভাবে ‘সৎ' এই শব্দ প্রয়ােগ হয় তদ্রুপ মাঙ্গলিক কর্মে ব্ৰহ্মবাচক ‘সৎ’ শব্দ প্রযুক্ত হইয়া থাকে ॥ ২৬॥
শ্লোক: 27:
যজ্ঞে তপসি দানে চ স্থিতিঃ সদিতি চোচ্যতে ।
কর্ম চৈব তদর্থীয়ং সদিত্যেবাভিধীয়তে ॥২৭॥
অনুবাদ-যজ্ঞে, তপস্যায় ও দানে এবং তৎ-তাৎপৰ্য-নিশ্চয়পূর্বক অবস্থানেও সৎ শব্দ ব্যবহৃত হয় এবং ব্রহ্মপরিচৰ্যোপযােগী তন্মন্দির মার্জনাদিকেও ‘সৎ’ শব্দে অভিহিত করা হয় ॥ ২৭॥
শ্লোক: 28:
অশ্রদ্ধয়া হুতং দত্তং তপস্তপ্তং কৃতং চ যৎ ।
অসদিত্যুচ্যতে পার্থ ন চ তৎ প্রেত্য নো ইহ ॥২৮॥

0 comments:
Post a Comment