অর্জুন উবাচ
কিন্তব্ৰহ্ম কিমধ্যাত্মং কিং কর্ম পুরুষােত্তম।
অধিভূতঞ্চ কিং খােমধিদৈবং কিমুচ্যতে ॥১॥
অনুবাদ—অর্জুন বলিলেন,-হে পুরুষােত্তম! সেই ব্ৰহ্ম কি ? অধ্যাত্ম কি ? কৰ্ম্ম কি ? অধিভূত এবং অধিদৈবই বা কি? ॥১॥
অধিযজ্ঞঃ কথং কোহত্র দেহেহস্মিন্ মধুসূদন।
প্রয়াণকালে চ কথং জ্ঞেয়ােহলি নিয়ভিঃ । ২।
অনুবাদ—হে মধুসূদন! এই দেহে অধিযজ্ঞ কে? এবং এই দেহমধ্যে কিরূপে অবস্থিত আছেন ? এবং মৃত্যুকালে সংযতচিত্ত পুরুষগণ তােমাকে কি উপায়ে জানিতে পারেন ? ॥২||
শ্রীভগবানুবাচ
অক্ষরং পরমং ব্রহ্ম স্বভাবােহধ্যাত্মমুচ্যতে।
ভূতভাবােবকরাে বিসর্গঃ কর্মসংজ্ঞিতঃ ॥ ৩॥
অনুবাদ—শ্রীভগবান্ কহিলেন—নিত্য—বিনাশরহিত পরমতত্ত্বই ব্ৰহ্ম, অধ্যাত্ম-শব্দে শুদ্ধ জীব এবং ভূতগণের উৎপত্তি ও বৃদ্ধিকর সংসারই কৰ্ম্মনামে অভিহিত ॥৩॥
অধিভূতং ক্ষনাে ভাবঃ পুরুষশ্চাধিদৈবতম্।
অধিযজ্ঞােইহমেত্র দেহে দেহভৃতাং বর॥ ৪।
অনুবাদ—হে সৰ্ব্বপ্রাণিশ্রেষ্ঠ ! নশ্বর পদার্থ সমূহই অধিভূত, বিরাট পুরুষই দেবগণের অধিপতি অধিদৈব, এই দেহে অবস্থিত আমিই অধিযজ্ঞ, অর্থাৎ অন্তর্যামীরূপে যজ্ঞাদি কৰ্ম্ম-প্রবর্তক ॥৪॥
অন্তকালে চ মামেব স্মর মুক্ত কলেবরম্।
যঃ প্রয়াতি স মদ্ভাবং যাতি নাস্ত্যত্র সংশয়ঃ ॥৫॥
অনুবাদ—যিনি অন্তিমকালেও আমাকেই স্মরণপূর্বক স্বীয় কলেবর পরিত্যাগ করিয়া প্রস্থান করেন, তিনি আমার ভাবই প্রাপ্ত হন, ইহাতে কোনই সংশয় নাই ॥ ৫॥
যং যং বাপি স্মর ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবর।
তং তমেৰৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ ॥৬॥
অজুবাদ—হে কৌন্তেয়। যিনি যে যে বিষয় চিন্তা করিতে করিতে অন্তিমকালে শরীর ত্যাগ করেন, তিনি সেই সেই ভাবই প্রাপ্ত হন, কারণ সর্বদা সেই ভাবনা-দ্বারা তাঁহার চিত্ত তন্ময়ীভূত হইয়া থাকে ৬ ॥
তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু মামনুস্মর যুধ্য চ।
মধ্যর্পিতমনােবুদ্ধিৰ্ম্মামেবৈষ্যসৃসংশয়ঃ ॥৭॥
অনুবাদ—সেই হেতু সর্বদা আমাকে চিন্তা কর এবং যুদ্ধ কর, তাহা হইলে আমাতে মনবুদ্ধি সমর্পিত হইয়া আমাকেই নিঃসংশয়রূপে পাইবে। ৭।
অভ্যাসযােগযুক্তেন চেতসা নাগামিনা।
পরমং পুরুষং দিব্যং যাতি পার্থানুচিন্তয়৷৮।
অনুবাদ—হে পার্থ ! অভ্যাসরূপ-যােগসহকারে বিষয়ান্তর হইতে প্রত্যাহৃত চিত্তের দ্বারা, একমাত্র দিব্য পরম পুরুষকে চিন্তা করিতে করিতে তাহাকেই প্রাপ্ত হওয়া যায় ॥ ৮||
কবিং পুরাণমনুশাসিতারমণােরণীয়াং অনুশ্রয়ে ষঃ।
সর্বস্য ধারমচিন্ত্যরূপমাদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ ॥৯॥
প্রয়াণকালে মনসাচলেন
ভক্ত্যা যুক্তো যােগবলেন চৈব।
জবােশ্মধ্যে প্রাণমাবেশ সম্যক
স তং পরং পুরুষমুপৈতি দিব্যম্। ১০।
অনুবাদ—সর্বজ্ঞ, সনাতন, অখিল নিয়ন্তা, সূক্ষ্ম হইতেও সূক্ষ্মতর, সকলের বিধাতা, অচিন্ত্যরূপ; সূর্যের ন্যায় প্রকাশ ও প্রকৃতির অতীত পুরুষকে, যিনি মরণকালে একাগ্রচিত্তে, ভক্তি-সহকারে, যােগবলে, হৃদ্বয়ের মধ্যে আজ্ঞাচক্রে, প্রাণবায়ুকে সম্যক্ স্থাপন পূর্বক চিন্তা করেন, তিনি সেই দিব্য পরমপুরুষকে প্রাপ্ত হন ॥৯-১০॥
যদক্ষরং বেদবিদো বদন্তি বিশন্তি যতয়াে বীতরাগাঃ।
যদিচ্ছন্তো ব্রহ্মচর্য্যং চরক্তি তত্তে পদং সংগ্রহেণ প্রবক্ষ্যে ॥১১
অনুবাদ-বেদজ্ঞ পণ্ডিতগণ যাঁহাকে অক্ষর বলিয়া বলেন, বীতরাগ সন্ন্যাসিগণ যাহাতে প্রবিষ্ট হন, যাঁহাকে পাইতে ইচ্ছা করিয়া ব্ৰহ্মচারিগণ ব্রহ্মচর্য অনুষ্ঠান করেন, সেই প্রাপ্য-বস্তুর কথা সংক্ষেপে তোমাকে বলিতেছি ॥১১॥
সর্ববদ্বাৱাণি সংযম্য মনাে হৃদি নিরুধ্য চ।
মূৰ্দ্ধধায়াত্মনঃ প্রাণমাস্থিতে যােগধারণা। ১২।
ওমিত্যেকাক্ষরং ব্রহ্ম ব্যাহর মামনুস্মর।
যঃ প্রয়াতি ত্যজ দেহং স যাতি পরমাং গতিম্ ॥ ১৩।
অনুবাদ--সকল ইন্দ্রিয়দ্বার সংযমপূৰ্ব্বক মনকে হৃদয়ে নিরােধ করিয়া, দ্বয়ের মধ্যে প্রাণ বায়ুকে স্থাপন করত, আত্মবিষয়ক সমাধিরূপ যােগস্থৈর্য- সহকারে ও একাক্ষর এই ব্ৰহ্মবাচক শব্দ উচ্চারণ করিতে করিতে এবং আমাকে ধ্যান করিতে করিতে দেহত্যাগ পূর্বক, যিনি প্রয়াণ লাভ করেন, তিনি পরমাগতি প্রাপ্ত হন। ১২-১৩।
অনন্যচেতা সততং যে মাং স্মরতি নিত্যশঃ।
ভত্যাহং সুলভঃ পার্থ নিত্যযুক্তস্য যােগিলঃ ॥ ১৪।
অনুবাদ—হে পার্থ ! অনন্যচিত্ত হইয়া যিনি আমাকে সতত প্রতিদিন ধ্যান করেন সেই ভক্তিযােগবান যােগীর পক্ষে আমি সুলভ ॥ ১৪॥
মামুপেত্য পুনর্জন্ম দুঃখলিয়মশাশ্বতম্ ।
নাপ্ত বন্তি মহাত্মালঃ সংসিদ্ধিং পরমাং গতাঃ ॥ ১৫।
অনুবাদ—মহাত্মাগণ আমাকে প্রাপ্ত হইয়া পুনরায় দুঃখের আশ্রয়স্বরূপ অনিত্য-জন্ম লাভ করেন না, কারণ তাহারা পরম সিদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছেন ॥১৫॥
আব্রহ্মভুবল্লোকাঃ পুনরাবৰ্ত্তিনােহৰ্জ্জুন।
মামুপেত্য তু কৌন্তেয় পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে ॥১৬।
অনুবাদ—হে অর্জুন! ব্ৰহ্মলােক হইতে যাবতীয় লােক বা লােকবাসীর পুনরাবর্তন অর্থাৎ পুনর্জন্ম হয়, কিন্তু হে কৌন্তেয় ! আমাকে প্রাপ্ত হইলে আর পুনর্জন্ম হয় না ॥ ১৬ ||
সহস্ৰযুগপৰ্যন্তমহ ব্ৰহ্মণণা বিদুঃ।
রাত্রিং যুগসহস্ৰান্তাং তেহােরাত্রবিদো জনাঃ ॥১৭।
অনুবাদ—সহস্ৰচতুর্যুগব্যাপী ব্রহ্মার একদিন, সহচতুযুগব্যাপী এক রাত্রি, ইহা যাহারা জানেন, তাঁহারা অহােরাত্ৰ তত্ত্ববো ॥১৭॥
অব্যক্তাব্যক্তয়ঃ সর্বাঃ প্রভব্যহরাগমে।
রাত্রাগমে প্রলীয়ন্তে তত্রৈবাব্যক্তসংজ্ঞকে৷ ১৮ ॥
অনুবাদ—ব্রহ্মার দিবাকাল উপস্থিত হইলে, অব্যক্ত কারণস্বরূপ হইতে যাবতীয় চরাচর শরীরবিষয়াদি ভােগভূমিসমূহ প্রকাশ লাভ করে এবং রাত্রিকাল উপস্থিত হইলে, সেই অব্যক্তনামক কারণস্বরূপে সমুদয় লয় প্রাপ্ত হয় || ১৮ ||
ভূতগ্রামঃ স এবায়ং ভূত্বা ভূত্বা প্ৰলীয়তে।
রাগমেহবশঃ পার্থ প্রভৰত্যহরাগমে। ১৯।
অনুবাদ—হে পার্থ ! এই সেই ভূতসমূহ বার বার উৎপন্ন হইয়া রাত্রিকালে লয় প্রাপ্ত হয়, পুনরায় দিবাকাল উপস্থিত হইলে নিয়মাধীন হইয়া প্রাদুর্ভূত হয় ॥১৯॥
পরস্তম্মা, ভাবােহদ্যোইব্যক্তোহব্যক্তাৎ সনাতনঃ।
যঃ স সর্বেষু ভূতেষু নশৎসু ন বিনশ্যতি ॥ ২০ |
অনুবাদ—কিন্তু পূর্বোক্ত অব্যক্তভাব হইতে স্বতন্ত্র শ্রেষ্ঠ, সনাতন যে অব্যক্ত ভাব, তাহা যাবতীয় ভৌতিক পদার্থের নাশেও বিনষ্ট হয় না॥২০॥
অব্যক্তোক্ষর ইত্যুক্তস্তমাহুঃ পরমাং গতিম্।
যং প্রাপ্য ন নিবৰ্ত্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম। ২১।
অনুবাদ—সেই অব্যক্ততত্ত্বকেই অক্ষর বলে ও তাহাকে পরমা গতি বলিয়া থাকে, যাহাকে প্রাপ্ত হইলে জীবকে আর সংসারে প্রত্যাবর্তন করিতে হয় না, তাহাই আমার পরমধাম বা নিত্যস্বরূপ ॥২১॥
পুরুষঃ স পয়ঃ পার্থ ভক্ত্যা লভ্যনন্যয়া।
যস্যান্তঃস্থানি ভূতানি যেন সর্বমিদং তম্ ॥ ২২।
অনুবাদ—হে পার্থ ! ভূতসমূহ যাহার মধ্যে অবস্থিত, যদ্দারা এই সমগ্র জগৎ পরিব্যাপ্ত, সেই পরমপুরুষ আমি কিন্তু, একমাত্র অনন্যা-ভক্তির দ্বারাই প্রাপ্য ॥২২॥
যত্র কালে ত্বনাবৃত্তিমাবৃত্তিঞ্চৈব যােগিনঃ।
প্রয়াতা যান্তি তং কালং বক্ষ্যামি ভরতভ॥ ২৩।
অনুবাদ—হে ভরত ! যােগিগণ যে কালে দেহত্যাগ পূৰ্ব্বক যে মার্গে গমন করিলে সংসারে পুনরাগমন ও অপুনরাগমন লাভ করিয়া থাকেন, সেই ( কালাভিমানী দেবতা-পালিত ) মার্গের বিষয় বলিতেছি ॥২৩॥
অগ্নিজ্যোতিরহঃ শুক্লঃ ষঞ্জাসা উত্তরায়ণ।
তত্র প্রয়াত গচ্ছন্তি ব্ৰহ্ম ব্ৰহ্মৰিদো জনাঃ ॥২৪।
অনুবাদ—অগ্নি, জ্যোতি, শুভদিন, শুক্লপক্ষ, যগ্মসরূপ উত্তরায়ণ কালে এই সকল কালাভিমানিনী দেবতার মার্গে, যে সকল ব্ৰহ্মবিৎ ব্যক্তি প্রয়াণ লাভ করেন, তাহারা ব্ৰহ্মকে প্রাপ্ত হন॥২৪॥
ধূমম রাত্রিস্তথা কৃষ্ণঃ ভগ্নাসা দক্ষিণায়ন।
তত্র চান্দ্রমসং জ্যোতিৰ্যোগী প্রাপ্য নিবৰ্ত্ততে। ২৫।
অনুবাদ—ধূম, রাত্রি, কৃষ্ণপক্ষ, ছয়মাসরূপ দক্ষিণায়ন কালে তদুপলক্ষিত দেবতার মার্গে গমনশীল কৰ্ম্মযােগিগণ চন্দ্র-জ্যোতিস্বরূপ স্বর্গলােক লাভ করিয়া উপভােগান্তে সংসারে পুনরাবর্তন করে ॥২৫॥
শুক্লকৃষ্ণে গতী হেতে জগতঃ শাশ্বতে মতে।
একয়া যাত্যনাবৃত্তিমন্যয়াবৰ্ত্ততে পুনঃ ॥ ২৬।
অনুবাদ—শুক্ল ও কৃষ্ণ-জগতের এই দুইটি গতিই অনাদি বলিয়া সম্মত। একটির দ্বারা শুক্ল অর্থাৎ অর্চিরাদি মার্গে মােক্ষ লাভ হয়, অন্যটির দ্বারা—কৃষ্ণ অর্থাৎ ধূমাদিমার্গে সংসারে পুনর্জন্ম হয় ॥২৬ ||
নৈতে স্তী পার্থ জান যােগী মুহতি কশ্চন।
তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু যােগযুক্তো ভবাৰ্জ্জুন॥ ২৭ ॥
অনুবাদ—হে পার্থ ! এই উভয় গতি অবগত হইলে কোন যােগী মােহ প্রাপ্ত হন না, সুতরাং হে অর্জুন! সৰ্ব্বদা সমাহিত চিত্ত হও ॥২৭॥
বেদেষু যজ্ঞেষু তপঃ চৈব
দানেষু যৎ পুণ্যফলং প্রদিষ্টম।
অত্যেতি তৎ সর্বমিদং বিদিত্বা
যােগী পরং স্থানমুপৈতি চা৷ ২৮।
অনুবাদ—বেদপাঠ, যজ্ঞানুষ্ঠান, তপস্যা এবং দানকৰ্ম্মাদিতেও যে সকল পুণ্যফল শাস্ত্রে উপদিষ্ট হইয়াছে, মৎকথিত এই তত্ত্ব অবগত হইলে, 'ভক্তিযােগী সে সকল অতিক্রম করিয়া অনাদি ও অপ্রাকৃত স্থানকে প্রাপ্ত হন ॥ ২৮ ॥
0 comments:
Post a Comment