বিধাতার ইঙ্গিত
বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেত, বিশ্বশিল্পী তাহার দেব কল্পনায়, সুনিপুণভাবে মহাবিশ্ব সুসজ্জিত করিয়া, জীবশ্রেষ্ঠ সৰ্বগুণসম্পন্ন মানব সৃজন করেন। পরমকারুণিক সৃষ্টির অলক্ষ্যে থাকিয়া মানবকে ইঙ্গিতে
উপদেশ দান করেন। বুদ্ধিবলে উহা অনুসরণ করিয়া মানব নিজেরও জগতের হিতসাধন করিয়া থাকে।
জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে, চেন, অচেতন সর্ব পদার্থে, সর্ব জীবে, বিধাতার ইঙ্গিত প্রকট। বুদ্ধি ও যােগবলে, বিধাতার এই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত সঠিক নির্ধারণ করিয়া ত্রিকালজ্ঞ ঋষিগণ সাধারণের নিমিত্ত লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। এই সকল গ্রন্থই বিভিন্ন শাস্ত্র নামে অভিহিত। সৰ্ব্ব যুগেই হিন্দুসমাজ এই সকল শাস্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী কাৰ্য্য করিয়া আসিতেছে। এমন এক দিন ছিল, যখন লােক জ্ঞানবলে অথবা জ্ঞানিগণের উপদেশানুসারে কাৰ্যাদি করিত। পাশ্চাত্ত্যবিদ্যাভিমানিগণের মধ্যে অন্ধ বিশ্বাসের বশবর্তী এক বিরল। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সহযােগে না বুঝাইয়া দিলে, শাস্ত্রোক্ত শাহ ধৰ্ম্মকথাও বর্তমান যুগে ইহার গ্রহণ করিতে ইতস্তত করেন। তাঁহারা ভুলিয়া যান যে, কল্পলােকের বিজ্ঞান-উৎসের কয়েকটি ধারা লইয়া, বিশ্ববৈজ্ঞানিক এই জড়জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন। অনন্ত শূন্যে (পৃথিব্যাদি ) ঘূর্ণায়মান গ্রহাদির সংস্থান সৃষ্টিকর্তার অদ্ভুত বিজ্ঞান-শক্তির প্রকৃষ্ট পরিচয় সতত প্রদান করিতেছে। এই সব দেখিয়া, শুনিয়া এবং বুঝিয়াও জীব এই চির সত্যের সম্যক উপলব্ধি করিতে অক্ষম; কিন্তু দৈনন্দিন কর্ম-জীবনে নানা ক্ষেত্রে মানব বিধাতার ইঙ্গিত অনুযায়ী কাৰ্য করিয়া থাকে। আকাশে, দিবসে বা রাত্রিকালে মেঘমালা ও ক্ষত্ররাজির সঞ্চরণাদি দেখিয়া ঝড়-বৃষ্টি, শীত-উষ্ণাদি বহু বিষয় জনসাধারণ, এমন কি, গ্রাম্য লােকগণও বিধাতার ইঙ্গিতে প্রকৃতির লীল। বুঝিতে পারেন। বর্ণ ও প্রকৃতি দেখিয়া মৃত্তিকায় কি শস্য উৎপন্ন ,
হইতে পারে, নিরক্ষর কৃষকগণ তাহা অনায়াসে বুঝিতে সমর্থ হয়। জ্ঞানিগণ ইহা অপেক্ষা অধিক তথ্য বুঝিতে পারেন। কারণ, কত নিমে জল বা খনিজ পদার্থ আছে, তাহা তাঁহারা সহজেই অনুমান করিতে
সমর্থ। জলের রঙ ও স্বাদে জলের প্রকৃতি নির্ধারিত হইয়া উহার তদনুরূপ ব্যবহার হইয়া থাকে। অঙ্কুর হইতে আরম্ভ করিয়া বৃক্ষ লতাদির গঠন, কাণ্ড, পত্র-রেখাদি দৃষ্টে উহাদের অবস্থা সম্যকরূপে বােধগম্য হয়। তার্কিক বা অবিশ্বাসিগণ হয় ত বলিবেন যে, প্রাকৃতিক নিয়মে উহা সংগঠিত হয় এবং বুদ্ধিমান মানব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ফলে তাহা বুঝিতে পারেন। আমাদের বক্তব্য এই যে, উহাই বিশ্বপ্রকৃতি বা
বিশ্বনিয়ন্তার ইঙ্গিত।
মানবের মঙ্গলার্থ মঙ্গলময় পরমেশ্বর মানবের ললাট, কর ও পদতলে। নানা রেখায় মানব-জীবনের সকল তত্ত্ব বিবৃত করিয়া দিয়াছেন। অনেকে বলিয়া থাকেন, গর্ভাবস্থায় শিশুর হস্ত মুষ্টিবদ্ধ থাকে বলিয়া মাংসপেশীর সঙ্কোচনে হন্তে রেখার উৎপত্তি হয়। কিন্তু তাহা হইলে প্রত্যেকের হস্তরেখা বিভিন্ন না হইয়া অধিকাংশের হস্তরেখা একই প্রকারের হইত। অধিকন্তু জন্মের পর হস্ত মুষ্টিবদ্ধ না থাকা হেতু অথবা করতলে স্ফোটকাদি ক্ষত বা অস্ত্রোপচার হইবার ফলে রেখাগুলি অন্তর্হিত হইত। অপিচ, ঐ যুক্তিবলে গর্ভস্থ শিশুর ললাট বা পদতল কুঞ্চিত থাকায় ঐ ঐ স্থানে রেখাপাত কদাচ সম্ভব হইত না। সুতরাং
ইহা সহজেই অনুমিত হইতেছে যে, জীব-সৃষ্টিকালে সৃষ্টিকর্তা জীবের কর, পদ ও ললাটে রেখাপাত করিয়া জীবনের ঘটনাবলী দর্পণের ন্যায় প্রতিবিম্বিত করিয়া রাখিয়াছেন। সামুদ্রিক বিদ্যায় অভিজ্ঞগণ
উহা উপলব্ধি করিতে পারেন। চক্ষু থাকিতেও অনেকে ভগবানের এই ইঙ্গিত দেখিতে ও বুঝিতে পারে না। বাস্তবিক মানবের করতলই মানব-জীবনের দর্পণ। উহাতে মানবের দেহ ও মনের অবস্থা এবং
ভাগ্যাদি সর্বথা সম্যকরূপে প্রতিভাত হইয়া থাকে। শিক্ষিত ও শিক্ষার্থিগণ করতলস্থ অক্ষুট বা পরিস্ফুট রেখাদি পাঠে, উহার অর্থ অনায়াসে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন। পূৰ্বেই বলিয়াছি দেবকল্প মহর্ষিগণ বিধাতার ইঙ্গিত প্রত্যক্ষ করিয়া, জ্ঞানবলে মানব-জীবনের অবশ্য প্রয়ােজনীয় সকল তথ্যই গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছেন এবং উহাই বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্র নামে বিদিত। মানবের আয়ু সম্বন্ধীয়। যাবতীয় বিষয় আয়ুৰ্বিচার অংশে বর্ণিত আছে। উক্ত অংশের যে শাখায় হস্ত-পদাদির রেখা পাঠের বিষয় বিবৃত আছে, তাহাকে ‘সামুদ্রিক শাস্ত্র’ বলে। স্থূলভাবে ডাক্তার-বৈদ্যগণ সাধারণত মানবের মুখমণ্ডল, হস্ত-পদাদি নিরীক্ষণ করিয়া রােগের প্রকৃতি নির্ধারণ করেন। মস্তিষ্ক ও দেহযন্ত্রের সহজ ও বিকৃতাবস্থা সূক্ষ্ম স্নায়ুমণ্ডলীর মধ্য দিয়া করতলে প্রতিফলিত হয়। এই জন্য দেখা যায়, নখ দেখিয়া, নখা টিপিয়া বা করতলের বর্ণ দেখিয়া চিকিৎসকগণ রােগনির্ণয় করিয়া থাকেন। পরীক্ষা দ্বারা স্থিরসিদ্ধান্ত হইয়াছে যে, মানবের স্বাস্থ্য, চিন্তা, ভাব-ধারা, প্রবৃত্তি, উত্তেজনাদি মস্তিষ্ক হইতে প্রসূত হইয়া স্নায়ুমণ্ডলীর সাহায্যে করতল, ললাট, বদন ও পদতলে রেখাবিশেষে সূচিত হইয়া থাকে। এই জন্য লজ্জা-ভয়, ব্যাধি বা বিষাদে
মুখমণ্ডলের বর্ণ বিভিন্ন প্রকারে পরিবর্তিত হয়। ইহার বিস্তৃত আলােচনা নিপ্রয়ােজন—কেননা, সকলেই ইহা লক্ষ্য করিয়া থাকেন।
স্বাস্থ্য, চিন্তা ও উত্তেজনাদির ফলে, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রক্তকণিকাগুলি করতলস্থ রেখাদির বর্ণের তারতম্য ঘটায়। রেখাজ্ঞানসম্পন্ন সুধী-মাত্রেই তাহা দেখিয়া বুঝিতে পারেন। যাহারা স্মরণাতীত কালের কথা বিশ্বাস করিতে চাহেন না, তাঁহাদিগের জন্য বর্তমান যুগের আধুনিক ঘটনার উল্লেখ সমীচীন মনে করি। এই যুগে সার চালস বেল বিশিষ্টরূপে প্রমাণ করিয়া সভ্য জগৎকে দেখাইয়াছেন যে, করতলস্থ সূক্ষ্ম
স্নায়ুমণ্ডলীর সহিত মন ও মস্তিষ্কের ঘনিষ্ঠ যােগ থাকায় কররেখা দ্বারা মন ও মস্তিষ্কের ভাষা বুঝিতে পারা যায়। সুবিখ্যাত স্কটল্যণ্ড ইয়ার্ডের বিশ্ববিদত ডিটেকটিভগণের পাঠাগারে সামুদ্রিক বিদ্যা সম্বন্ধীয়
প্রভূত গ্রন্থ আছে। মসিয়ে বার্টিল ও কতিপয় ফরাসী দেশীয় পুলিশ কর্মচারী অপরাধী বা অভিযুক্তগণের হস্তরেখাদি বিচার করিয়া উহাদের মানসিক বৃত্তি ও চরিত্রাদির বিষয় বিশদ ভাবে বর্ণনা করিয়াছেন।
পাশ্চাত্ত্য জগতে এখনও ডিটেকটিভগণ সময় সময় চতুরতার সহিত অতর্কিতে সন্দিগ্ধ ব্যক্তিগণের কররেখাদি দেখিয়া নিজেদের কর্মপন্থা ঠিক করিয়া থাকেন। মানব-চরিত্র বিশ্লেষণে যদি কররেখা সহায়ক ও কাৰ্যকরী বলিয়া গণ্য হয়, তাহা হইলে মানব-জীবনের জ্ঞাতব্য অন্যান্য বিষয় তারা নিরূপিত হইবে না কেন? পুরাকালে জ্যোতিষ ও সামুদ্রিক বিদ্যাবলে বহু কাৰ্য্য সম্পাদিত হইত। ভারত হইতেই এই বিদ্যা জগতের সর্বত্র প্রচারিত হয়। এককালে গ্রীস্ দেশে জ্যোতিষ ও সামুদ্রিক বিদ্যার বিশেষ আলােচনা হইত। গ্রীক ভাষায় করকে cheir বলে। ভারত হইতেই যে উহা গ্রীসে প্রচারিত হইয়াছে, ভারতীয় কর’ শব্দের উচ্চারণের সহিত গ্রীসীয় cheir শব্দের উচ্চারণ-সাদৃশ্য হইতেও ইহা অনুমিত হইতেছে।
‘মানবের অদৃষ্ট মানবের হাতে'—ইহা শাস্ত্রোক্ত চিরসত্য। হিন্দু- শাস্ত্রে সন্দিহান ব্যক্তিগণের শ্বাসােৎপাদন জন্য বলিতেছি যে, তাহারা ইংরাজীতে অনুদিত হিব্রু Book of Job গ্রন্থের সপ্তত্রিংশ পরিচ্ছদের সপ্তম শ্লোকে দেখিতে পাইবেন :-“God caused signs or scals on the hands of all the sons of men, that the sons of men might know their works." দেহের যে কোনও একটি অস্থি পরীক্ষা করিয়া যদি শারীরতত্ত্ববিদগণ দেহের সমুদয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সম্যক্ বিবরণ বলিতে সক্ষম হন, তাহা হইলে দেহের প্রধান কার্যকরী অঙ্গহস্ত দেখিয়া, সামুদ্রিক বিদ্যায় পারদর্শী সুধীগণও মানবের গুঢ়তত্ব বলিতে পারিবেন না কেন? হস্তরেখা দৃষ্টে কেবল যে বর্তমান জীবনের ফলাফল বলা যায়, তাহা নহে, পূর্বজন্মের বিষয়ও বলা যায়। দেহান্তর গ্রহণ করিয়াও মানব পূৰ্বজন্মজ্জিত সংস্কার ভুলিতে পারে না; উহার বিকাশ মানব-চরিত্রে পরিস্ফুট হয়, তদ্রুপ পূর্বজন্ম-বৃত্তান্তও রেখাবিশেষ দ্বারা মানব-শরীরে প্রকাশিত হইয়া থাকে ; ইহা তর্কের বিষয়ীভূত নহে—পরীক্ষিত সত্য। এককালে যাহা ভ্রান্তধারণা’, ‘অন্ধবিশ্বাস’ বলিয়া পরিগণিত হইত, বর্তমানে পাশ্চাত্ত্য ও ভারতীয় সুধীগণের গভীর গবেষণার ফলে, তাহ বৈজ্ঞানিক সত্য বলিয়া প্রমাণিত হইতেছে।

0 comments:
Post a Comment